ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়া থেকে একের পর এক শক্তিশালী বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পেছনে একই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণের পর এ তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতায় লুকানো ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি এবং সাভার-আশুলিয়া থেকে উদ্ধার করা প্রেশার কুকার বোমা (প্রেশার কুকারের ভেতরে বিশেষ কায়দায় তৈরি বোমা) তৈরির কৌশল একই গোষ্ঠীর। এতে ধারনা করা হচ্ছে, এগুলো একই উগ্রবাদী দলের হাতে তৈরি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া বা পালিয়ে যাওয়া উগ্রবাদী নেতা ও বোমা তৈরির কারিগরেরা গোপনে সংগঠিত হয়ে নতুন সদস্যদের কাছে বোমা বানানোর প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ‘কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত উগ্রবাদীরা সেখান থেকে পালিয়ে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। আমাদের কাছে তথ্য ছিল তারা দুটি বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক বোমা তৈরি করেছে, যার দুটিই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’ পুলিশ সুপার জানান, এসব অপতৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
১২ দিনে ১৬ বোমা উদ্ধার ও দুই বিস্ফোরণের ঘটনা
গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাভার ও আশুলিয়ার পৃথক তিন এলাকা থেকে অন্তত ১৬টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের জামিআ ইলমুল ইলাহ সোসাইটি মাদ্রাসা ও মসজিদের সামনের জঙ্গল থেকে স্কচটেপে মোড়ানো একটি শক্তিশালী প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে গত বুধবার বিকেল ৩টা ২৮ মিনিটে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে, যার বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে।
এর আগে গত ৩০ জুলাই মধ্যরাতে আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে আরেকটি প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪টি পাইপবোমা ও বিস্ফোরক তৈরির বিপুল গানপাউডার উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে আরিফ হোসেন নামের একজনকে পাঁচটি বিস্ফোরকসহ হেমায়েতপুর থেকে আটকের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাইপবোমাগুলো উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ১১ জুলাই আশুলিয়ার ভাদাইল পাবনারটেক এলাকায় ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণে রনি নামের এক তরুণের বাঁ হাতের কবজিসহ আঙুল উড়ে যায়। অন্যদিকে ৬ জুলাই রাতে সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রা শেষে সমাবেশে বিস্ফোরণে চারজন আহত হন। এসব ঘটনায় আশুলিয়া ও সাভার থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম জানান, প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধারের মামলায় তদন্ত চলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ঢাকার আশপাশে উগ্রবাদীদের তৎপরতা বাড়ার কারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলো উগ্রপন্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে সহজে বিস্ফোরক তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি পরামর্শ দেন, বাড়িমালিকদের অবশ্যই ভাড়াটিয়াদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভাড়ার চুক্তির কপি থানায় জমা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান কেনাবেচায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মো. শামছুল হক জানান, সবগুলো বিস্ফোরক উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এর নেপথ্যে থাকা পুরো উগ্রবাদী চক্রটিকে আইনের আওতায় আনা হবে।