Image description

গ্যাসের সরবরাহ চাপ তলানিতে নেমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের ভারী শিল্পে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। গতকাল থেকে ইস্পাত, কাচ, ভোজ্যতেলসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন ভারী শিল্প-কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

কয়েক দিন ধরে সক্ষমতার অর্ধেক বা তারও কমে উৎপাদন চালানোর পর শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ শাটডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তারা। এতে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের লোকসান ও অনিশ্চয়তা।

চট্টগ্রামের ভারী শিল্পে এ আকস্মিক শাটডাউনের মূল কারণ জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের বড় ঘাটতি। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, অন্যটি থেকেও মিলছে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক গ্যাস। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ বন্ধের পর্যায়ে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আহরণেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

রডের মধ্যবর্তী কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ চট্টগ্রামভিত্তিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপের অধীনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট হাজার টন পণ্য উৎপাদন হয়। গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলীহুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট হলে বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকদের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ থাকে। তারা এলপিজি বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিকল্প খুবই সীমিত। তাই সংকটের সময়ে শিল্পকে প্রথম অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট হারে লোড কমিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু সম্পূর্ণ শাটডাউন বড় ধরনের ক্ষতি।’

কারখানা কমপ্লিট শাটডাউনের মতো পরিস্থিতি আগে কখনো মোকাবেলা করতে হয়নি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এতে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। বরং আগে থেকে ধারণা দিয়ে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় কারখানা চালু রাখার ব্যবস্থা করা যেত। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মীদের বেতন দিতে হয়, কারখানার অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও চলতে থাকে। অথচ উৎপাদন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এতে কোম্পানির লোকসান বাড়বে, আর লোকসান হলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের রাজস্ব আহরণও কমবে।’

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এক্সিলারেট থেকে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক গ্যাস মিলছে। দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার এ টার্মিনাল থেকে গতকাল ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। বয়লার নষ্ট থাকায় এর চেয়ে বেশি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাসের সংকট দেখা দিলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে সরবরাহ কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ রেখে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা উচিত। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যও আমদানি করে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও লোকসানের ঝুঁকি।

কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানির উদ্দেশ্যে আমাদের টেক্সটাইল কারখানায় যে কাপড় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতাম, উৎপাদন ভেঙে পড়ায় এখন সেটি বাইরের দেশ থেকে আনার চেষ্টা করছি। এতে লোকসান হলেও বায়ার ধরে রাখতে হবে। অন্যদিকে, আমাদের স্টিল কারখানায় আগের দিনই এসে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর জন্য বলে গেছে, নইলে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। আজ তো (গতকাল) স্টিল কারখানার পুরো উৎপাদন কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে গেছে।’

গ্যাস সংকটে শুধু উৎপাদন বন্ধই হচ্ছে না, দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কাঁচামাল ও উপকরণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। ফলে সংকট কতদিন চলবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য উৎপাদন ও আর্থিক পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

টিকে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে আমাদের কর্ণফুলী স্টিলের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার টন। বুধবার অল্প কিছু উৎপাদন করা গেলেও আজ (গতকাল) কোনো উৎপাদনই হয়নি। এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তার সময়সীমা জানা জরুরি। তাহলে আমরা সে অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাতে পারব। কারণ প্রতিদিনের ব্যয় তো বন্ধ নেই। ব্যাংকের সুদের মিটারও চলছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কাঁচামাল ও উপকরণ নষ্ট হওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। স্টিল কারখানার পাশাপাশি একই সঙ্গে আমাদের তেল উৎপাদনও বন্ধ হওয়ার পথে। আমাদের অন্যান্য শিল্প-কারখানাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

কাচ উৎপাদনের চুল্লি গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এ শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি অন্য অনেক শিল্পের তুলনায় বেশি। একবার চুল্লি চালু হলে তা টানা প্রায় এক যুগ সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে চুল্লি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় চালুর সুযোগ থাকে না। তখন পুরনো চুল্লি ভেঙে নতুন চুল্লি স্থাপন করতে হয়, যাতে নতুন করে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ সহকারী মহাব্যবস্থাপক (প্রডাকশন) সুলতান মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসনির্ভর শিল্প-কারখানাগুলোকে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার না দিলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। আমাদের উৎপাদন আজ (গতকাল) পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পিডিবি থেকে সামান্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তা দিয়ে কোনো রকমে শুধু বার্নারগুলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। চুল্লি একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালু করার সুযোগ নেই। নতুন করে চুল্লি স্থাপন করতে হবে। এতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে এবং কয়েকশ কোটি টাকা আবার বিনিয়োগ করতে হবে। এখন আমরা কোনোভাবে চুল্লিগুলো চালু রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন ধরে রাখতে পারব, সেটিও বুঝতে পারছি না।’

জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইস্পাত কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাস অপরিহার্য। গত সপ্তাহখানেক ধরেই গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হচ্ছিল। গ্যাসের চাপও ওঠানামা করছিল। আজ (গতকাল) চাপ একেবারেই নেমে যাওয়ায় কারখানা আর চালানো যাচ্ছে না। আমরা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দুইদিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছে। এখন এ অনিশ্চয়তার মধ্যেই কারখানা চালু রাখার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’

গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা এখন চট্টগ্রামের সব শিল্প খাতেই পড়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারখানাগুলো এতদিন গ্যাসের চাপ কম থাকলেও উৎপাদন কমিয়ে কোনোভাবে চালিয়ে নেয়া হচ্ছিল। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে ভারী শিল্প-কারখানাগুলোকে শাটডাউনে যেতে হয়েছে। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী। এখানকার শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহের সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতি করবে না, এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। আমাদের এনার্জি সিস্টেমে সব সময় অতিরিক্ত সক্ষমতা রাখতে হবে। শুধু বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় সক্ষমতা তৈরি করলে হবে না। বাংলাদেশে চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়া থাকে, এটা আমাদের বাস্তবতা। তাই শুধু ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। আমাদের ল্যান্ড-বেজড এফএসআরইউসহ স্থলভিত্তিক জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এমন একটি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে মৌসুমি সংকট বা বৈরী আবহাওয়ার কারণেও শিল্প-কারখানাকে হঠাৎ করে বন্ধ করে দিতে না হয়।’