ফেনী জেলাজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন ও লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব ফার্মেসির কারণে একদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরা যেমন লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ওষুধের অবাধ বিক্রিতে চরম হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঠিক নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেনীর ৬টি উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন অলিগলিতে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি ওষুধের দোকান। নিয়ম মোতাবেক এসব ফার্মেসিতে রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট থাকার কথা থাকলেও কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। সরকারি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক, যৌন উত্তেজক ও নেশাজাতীয় ওষুধ অবাধে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে জেলার সাধারণ মানুষ।
এদিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য এখন চরম পর্যায়ে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে নিজেদের কোম্পানির ওষুধ লেখাতে তারা নানা ধরনের উপহারসামগ্রী ও অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকেন বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক চিকিৎসক নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ লিখতে বাধ্য হচ্ছেন এবং সাধারণ রোগীরা সেই ওষুধ কিনে অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মাঝেমধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে নামিদামি কিছু ফার্মেসিকে জরিমানা করলেও জেলা ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ভূমিকার নজির নেই বললেই চলে।
খোদ ফেনী জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি ও রাজ্জাক মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দীন আহমেদ মিলন জেলার ওষুধ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জেলায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থাকলেও তাদের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। ড্রাগ অধিদপ্তরের অভিযান ও সঠিক মনিটরিং না থাকার কারণেই পুরো জেলাজুড়ে ১৫ হাজারের বেশি লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি গড়ে উঠেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। ড্রাগ লাইসেন্স না থাকায় এরা নির্বিঘ্নে অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে এবং সব ধরনের জবাবদিহিতার বাইরে থাকছে। ড্রাগ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে এদের যোগসাজশ রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ওষুধের দাম বাড়ার বিষয়টি সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত তিন মাসে জেলায় কোনো ওষুধের দাম বাড়েনি। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কোম্পানিগুলো ফেরত নেয় বলে বৈধ ফার্মেসিগুলো এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় যত্রতত্র ফার্মেসি দোকান বেশি হওয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রি কমে গেছে।
শহরের প্যারাগন মেডিকোর স্বত্বাধিকারী অমিত বণিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা আগের দিন এসে দাম বাড়ার ঘোষণা দেয় এবং পরদিনই নতুন রেটে ওষুধ দিয়ে যায়, যা সাধারণ ক্রেতাদের বিভ্রান্তিতে ফেলছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে অলিতে-গলিতে যেভাবে ফার্মেসি গড়ে উঠেছে এবং সেগুলোতে অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য চরম হুমকিতে পড়ছে।’
ফেনীর ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. সোহরাব আল হোসাইন তানভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নকল ও ভেজাল ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। ফেনীতে বর্তমানে ড্রাগ প্রশাসনের অভিযান তেমন চোখে পড়ে না। নিয়মিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা দরকার। এতে কোনটি ভালো ওষুধ আর কোনটি নকল, তা গ্রাহকরা সহজে বুঝতে পারবেন এবং সচেতন হয়ে ওষুধ কিনতে পারবেন।’
ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রোকন-উদ-দ্দৌলা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফেনীতে মাঝে মাঝে নকল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার খবর দেখতে পাই, তবে এটি নিয়মিত নজরদারি করা উচিত। নকল ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য সত্যিই ভয়ংকর এবং এসব অভিযান সবসময় চলমান থাকা উচিত।’
অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মো. আছাদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ফেনীর বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে ওষুধ বিক্রি, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ও অনুমোদনহীন পণ্য ফার্মেসিতে বিক্রির অভিযোগে মোট ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে দণ্ডিত করে সর্বমোট ২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মৌসুমী আক্তার জানান, ‘ফেনীতে ১ হাজার ৯০০-এর মতো অনুমোদিত ফার্মেসি রয়েছে এবং মাত্র ৪৫টি ফার্মেসি অনুমোদন ছাড়া চলছে বলে আমাদের তালিকায় আছে। অনুমোদনহীন এসব ফার্মেসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া জেলা ওষুধ প্রশাসনের কেউ যদি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতির ‘১৫ হাজার অবৈধ ফার্মেসি’ দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা যদি আমাদের এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণসহ তালিকা দেন, তবে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’