শহীদ আব্দুল কাইয়ুম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই তরুণের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বড় কিছু করা। কখনো ব্যবসা, কখনো সরকারি চাকরি- যে পথেই যাক না কেন; একটাই লক্ষ্য ছিল বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তার মৃত্যু শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্নও।
আব্দুল কাইয়ুম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ঢাকার সাভারের নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ৬ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আব্দুল কাইয়ুম নেই আজ দুবছর। সাভারের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তার বাবা-মা। সংসারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে হারিয়ে তাদের দিন কাটছে সরকারি ভাতা, সীমিত কিছু সহায়তা আর ছেলের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে।
কাইয়ুমের মা কুলসুম বলেন, ‘এভাবে হয় না বাবা, অনেক কষ্ট করে আমার সংসার চলে। আমার বাবা (কাইয়ুম) থাকতেও যেমন কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি, এখনো তেমনই কষ্ট করে চলছি। এখন তো ভাতার ২০ হাজার টাকার ওপরই আমার সংসার চলে। আপনার আঙ্কেলের (কাইয়ুমের বাবা) কানের সমস্যা, শরীরে নানা ধরনের সমস্যা; কাজকর্ম করতে পারে না।’
তিনি বলেন, আমার সংসারে কেউ ইনকাম করে না। বড় ছেলে যে টাকা কামাই করে, তা তার ছেলেমেয়ে-বউয়ের জন্যই লাগে। আমরা কোনোদিন ওর কাছে কিছু চাইনি। হঠাৎ যদি খুশি হয়ে দুই-চারশ টাকা দেয়, তাহলে নিই; জোর করি না।
কাইয়ুমের বাবা কফিল উদ্দিন জানান, তারা বর্তমানে সাভারের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি বলেন, সরকার যে ভাতা দেয়, তা দিয়ে টুকটাক করে সংসার চলছে। কিন্তু এ টাকায় সব হয় না। বাসা ভাড়াই আট হাজার টাকা।
সংসারের হাল ধরেছিলেন কাইয়ুম
কাইয়ুমের মা বলেন, কাইয়ুম অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছে বাবা। কুমিল্লায় তিনদিন থাকত, আবার তিনদিন সাভারে থাকত। এখানে এসে টিউশনি করত। ভোরে উঠে দুধে এনে তা বিক্রি করত। আবার দইয়ের অর্ডার নিয়ে দই বিক্রি করত; ভর্তি কোচিংও চালাত। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে আমার সংসারটা সে চালিয়েছে। বছরের অন্য সময় টিউশনি আর ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসারের খরচ জোগাত কাইয়ুম।
সরকারি সহায়তা
কাইয়ুম শহীদ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছে পরিবারটি। এ বিষয়ে কাইয়ুমের মা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারভিত্তিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাই।
সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে আর কী বলব বাবা। আমাদের চাওয়া-পাওয়া কি কেউ পূরণ করে দেবে? আমরা তো অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকি। নিজেদের একটি বাড়ি থাকলে ভালো হতো। আমার ছেলে বেঁচে থাকলে অনেক টাকা কামাই করত, অনেক কিছুই করত।
শোকের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই
ছেলে হারানোর শোক এখনো প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় পরিবারটিকে। কাইয়ুমের মা বলেন, ও থাকলে আমার সংসারটা অন্যরকম হতো। এখন ওর কথা মনে হলেই বুকটা ফেটে যায়। তবুও জীবন তো থেমে থাকে না। কষ্ট করেই চলছি।
কাইয়ুমের বাবা বলেন, ‘আল্লাহ যেমন চালাচ্ছেন, তেমনই চলছে। আল্লাহ না চালালে তো আর আমরা চালাতে পারব না।’
খোঁজ রাখেনি এনসিপি, বিএনপি-ছাত্রদল
সরকারি মাসিক ভাতা পেলেও জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের লোকজন সহায়তা করেছেন বলে জানান আব্দুল কাইয়ুমের মা। তিনি বলেন, কাইয়ুম শহীদ হওয়ার প্রায় এক মাস পর এক লাখ টাকা এবং দু-তিন মাস পর আরো এক লাখ টাকা দেয় জামায়াতে ইসলামী।
এছাড়া ঈদকেন্দ্রিক সহায়তার কথাও বলেন তিনি। কুলসুম বলেন, জামায়াতের কাছ থেকে দুই রোজার ঈদে ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছি। কোরবানির ঈদে খাসির গোশত দিয়েছে। এবার গরুর গোশত দিয়ে গেছে।
বিএনপি-ছাত্রদলের সহযোগিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, রোজার ঈদের আগে একজন আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়েছিলেন। বলেছিলেন টাকা দেবেন; কিন্তু দেননি। পরে আমাদের এই এলাকার যিনি এমপি হয়েছেন, তিনি ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আর একবার একটি প্রোগ্রামে চিনি, সেমাই, তেলসহ কিছু বাজার দিয়েছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনসিপি থেকেও একবার বাজার পাঠিয়েছিল। এরপর আর কোনো সহযোগিতা পাইনি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সময় কাইয়ুমের পরিবারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ যৌথভাবে সাত লাখ টাকার চেক দেয়। এ বিষয়ে তার মা বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয় টাকা দিয়েছিল। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১তম সিন্ডিকেট সভায় নতুন ক্যাম্পাসের ‘ছাত্র হল-১’-এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ আব্দুল কাইয়ুম হল’।
বিচার নিয়ে যা বললেন কাইয়ুমের মা
বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, বিচার কই পেলাম বাবা? এখনো একজন আসামিও ধরা পড়েনি। আমাদের একবারও কোর্টে ডাকেনি। আমি চাই না কোনো নির্দোষ মানুষ সাজা পাক। আর যারা সত্যিকারের দোষী, তারাই যেন শাস্তি পায়।
ছেলের মৃত্যু প্রসঙ্গে শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেন, ‘আমি যে কষ্ট পেয়েছি, এই কষ্ট যেন আর কোনো মা-বাবাকে আল্লাহ না দেন।’
ছেলের জন্য বিচার চান কাইয়ুমের মা। তবে নির্দোষ কারো শাস্তি নয়-এটাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। একদিকে অর্থকষ্ট, অন্যদিকে সন্তানহারা বুকের দীর্ঘশ্বাস। এ দুইয়ের মাঝখানেই প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে শহীদ আব্দুল কাইয়ুমের পরিবার।