সরকারের বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
দেশের বিভিন্ন উপজেলায় প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের ফলাফল ঘোষণার পর পরীক্ষাসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের অগ্রাধিকার দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বিক্ষোভ মিছিল, কোথাও ঝাড়ু ও জুতা মিছিল, আবার কোথাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ভাংচুর ও কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একের পর এক উপজেলায় স্থগিত করা হয়েছে ফলাফল।
সবশেষ গতকাল নাটোরের বাগাতিপাড়ায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভের সময় ইউএনও কার্যালয়ের দরজা-জানালা ভাংচুর এবং এক সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। একই জেলার লালপুরে ইউএনওর কক্ষের সামনে অবস্থান কর্মসূচির সময় আরো দুই সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা ফলাফল বাতিল করে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান।
এর আগে ৬ আগস্ট লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের খানা জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ওইদিনই নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন নিয়োগপ্রত্যাশী ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে পাটগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেনকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরদিন ‘অনিবার্য কারণবশত’ ফলাফল স্থগিত করে স্থানীয় প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল এ দুই জেলায়ই নয়, গত ও চলতি সপ্তাহে খুলনার পাইকগাছা, কক্সবাজারের মহেশখালী, বাগেরহাটের চিতলমারী, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ এবং রাজশাহীর বাঘা ও তানোর উপজেলায়ও ফ্যামিলি কার্ডের খানা জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ফল প্রকাশের পর এসব এলাকায়ও নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের বঞ্চিত করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও পরীক্ষার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না বলেও অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। কোনো কোনো এলাকায় ঝাড়ু ও জুতা মিছিলও করেছেন বিক্ষুব্ধরা। এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোয় ফলাফল স্থগিত করে স্থানীয় প্রশাসন।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম করেছেন ইউএনও। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠজনদের তালিকায় নাম দেয়া হয়েছে। সে কারণে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। অতি দ্রুত তালিকা সংশোধন করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে লালপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর (সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী) পরামর্শক্রমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বঞ্চিতরা বিক্ষোভ কর্মসূচি করেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়নকারী সংস্থা। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অধিদপ্তরের অধীনে পৃথকভাবে গঠন করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড সেল’। এর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয় গত মার্চে। ওই সময় দেশের নির্বাচিত কয়েকটি এলাকায় ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক যাচাইয়ে প্রায় ৭৭ হাজার পরিবারকে যোগ্য হিসেবে পাওয়া গেলেও পরে সরকারি পেনশন, সরকারি চাকরি বা অন্যান্য অযোগ্যতার শর্তে পড়ার কারণে প্রায় ছয় হাজার পরিবারকে বাদ দেয়া হয়। সব মিলিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্পে নির্বাচিত পরিবারের প্রায় ৯২ শতাংশের তথ্য সফলভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে আগামী ১৬ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা রয়েছে সরকারের। মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেয়া এক উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে ৮১ লাখ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনর্গঠিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় প্রতিটি যোগ্য পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক নারী সদস্যের নামে আর্থিক সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করে প্রকৃত দরিদ্র ও যোগ্য পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে। আর এ তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করবেন তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজাররা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরো কার্যক্রম তদারকি করবেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া হবে কাগজবিহীন। মাঠকর্মীরা মোবাইলভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। এতে ঘটনাস্থলের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থাও থাকবে। পরিবারের বসবাসের পরিস্থিতির ছবি তোলার পাশাপাশি নেয়া হবে ডিজিটাল স্বাক্ষর।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা এ কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ, বিক্ষোভ এবং ফলাফল স্থগিতের ঘটনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। বিভিন্ন উপজেলায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের ফলাফল স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’ এ সময় তিনি বিষয়টি নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
পরে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা করছে না। প্রকল্পটি সর্বজনীন এবং এর মূল লক্ষ্য প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেয়া। উপকারভোগীদের কে কোন রাজনৈতিক মতের সঙ্গে যুক্ত, সেটি আমাদের বিবেচ্য নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে যুক্ত করেছি। এখন সারা দেশে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার ভিত্তিতে পরীক্ষার মাধ্যমে ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।’
কিছু এলাকায় বিগত সরকারের আমলে আদমশুমারি বা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ আবারো এ কাজে যুক্ত হওয়ায় অভিযোগ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যথাযথভাবে পরীক্ষা নেয়া হয়নি বা পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই বেশি নেয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ কারণে কোথাও কোথাও ফলাফল স্থগিত বা বাতিল করা কিংবা বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।’
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রকল্পটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব মাঠ প্রশাসনের ওপর দেয়া হয়েছে। যারা আবেদন করেছেন, তাদের একটি ট্যাবের মাধ্যমে তথ্য ইনপুট দেয়ার কথা। কিন্তু কিছু এলাকায় দেখা যাচ্ছে, আগের সরকারের সময়ের তালিকা থেকে লোকজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। এ কারণেই জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে অল্প কিছু জায়গায় এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টের সহায়কদের চিহ্নিত করতেও সহায়তা করছে। আমাদের নিয়ত ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আশা করছি সবার সহায়তা পাব।’