ভারত একদিকে শেখ হাসিনা কার্ড খেলবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে- এ দুটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও দুই দেশের সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।
শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থকে সমুন্নত রেখেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। ভারত যদি শেখ হাসিনা কার্ড খেলে এবং একই সাথে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তাহলে তা পরস্পরবিরোধী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝবেন।
‘আমরা কখনো আওয়ামী লীগ হতে পারব না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য এসেছে যে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ভারত সরকার যদি সত্যিই শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন না করে, তাহলে তাকে ভারতের মাটিতে বারবার সভা করার এবং বিশ্বমিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কেন।
সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারত বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও রয়েছে। তাই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং দুই দেশের সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ভারতকে তিনি যা দিয়েছেন, ভারত তা চিরদিন মনে রাখবে। এখন ভারত তাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে- এ থেকে মনে হচ্ছে, সেই কথাই তারা সত্যিই মনে রেখেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো পতিত স্বৈরাচার যদি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী হন, তাহলে তাকে কীভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়- এটাই আমাদের প্রশ্ন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে যে তৎপরতা চালাচ্ছেন, ভারতের মাটিকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি বলে যে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে তারা সমর্থন করে না, তাহলে সেটিকে স্বাগত জানানোর কথা বলেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওসমান, আবু সাঈদসহ যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, শহীদদের রক্তের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারবন্ধ।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাই আমরা।
সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ আগস্টের অর্জন কোনো একটি গোষ্ঠী বা সংগঠনের অর্জন নয়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার ফল। এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক ১৭ বছরের সংগ্রাম। অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে মুক্ত করা, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, বিপ্লব সাধারণত সমাজ পরিবর্তন কিংবা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সেই অর্থে আন্দোলন করেনি। তারা ভোটের অধিকার এবং দীর্ঘদিন ধরে কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য আন্দোলন করেছে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিচার প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। আইসিটি আইনের আওতায় অপরাধী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হবে কি না, তাদের কার্যক্রম দীর্ঘ বা স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত হবে কি না, কিংবা অন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এসব বিষয়ে আইনি বিধান রয়েছে। এমনকি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দ্রুত তদন্ত শেষ হবে বলে তারা আশা করছেন।
একই সঙ্গে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারও চলমান বলে উল্লেখ করেন সালাউদ্দিন আহমেদ। কিছু বিচার ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং আরও অনেক মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিজেদের করে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতি করার চেষ্টা নিয়েও সমালোচনা করেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, শুধু চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৭১-এর চেতনা বিক্রি করে যে রাজনীতি করা হয়েছে, সেটিও ব্যর্থ হয়েছে। তার দাবি, শেখ হাসিনা ১৯৭১-এর চেতনা বিক্রি করতে করতে আজ দিল্লিতে গিয়ে বসে আছেন এবং আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ঢাকার রাজনীতিতে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
নতুন বন্দোবস্ত ও নতুন রাজনীতির কথা যারা বলছেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পুরোনো বন্দোবস্তের রাজনীতি বাংলাদেশে আর চলবে না। চেতনা বিক্রির রাজনীতিও আর চলবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না উল্লেখ করে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে এই গণঅভ্যুত্থান এসেছে।
মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনের মধ্যে আগের ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের কোনো ভূমিকা নেই- এমন ধারণাকে ইতিহাস অস্বীকার করার শামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।