জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের পর রাজধানীর বকশীবাজার এলাকার সরকারি মাদ্রাসা–ই–আলিয়া (আলিয়া মাদ্রাসা) এলাকা ছেড়ে গেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শিবিরের নেতা–কর্মীরা চলে যাওয়ার পর মাদ্রাসার একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে ঢুকেছেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা।
হলে ঢুকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি কক্ষে ভাংচুর চালিয়েছেন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা–কর্মীরা। এর এক পর্যায়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হককে মারধর করেছেন তাঁদের কয়েকজন। পরে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যেতে বলেন ছাত্রদল নেতা–কর্মীরা। তাঁরা বেরিয়ে গেলে হলের ফটকগুলোতে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতাকর্মী আলিয়া মাদ্রাসার হলে প্রবেশ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন।
হলের ফটকে তালা লাগানোর সময়ে উপস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতা মো. ইব্রাহীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা হল তালাবন্ধ করেছি। সব কিছু ঠিক হলে পরবর্তীতে খুলে দেওয়া হবে।’
সংঘর্ষে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৫ জন নেতা–কর্মী আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির ঢাকা মহানগর পূর্বের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুবদল ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আমাদের নেতা–কর্মীদের আহত করেছে। ফুয়াদ নামে আমাদের এক কর্মীর অবস্থা সংকটাপন্ন। তাঁর মাথায় ১২টি সেলায় দেওয়া লেগেছে।’
অপরদিকে ছাত্রদলের ৩০ জনের বেশি নেতা–কর্মী আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখার নেতা সাদ চৌধুরী জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিবিরের সন্ত্রাসীরা দফায় দফায় আমাদের ওপর হামলা করেছে। তাঁদের হামলায় আমাদের ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ছাত্রদল ও যুবদলের দুইজনের অবস্থা গুরুতর।’

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ নিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকেই আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায় উত্তেজনার শুরু হয়। উত্তেজনার এক পর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীদের মধ্যে এক দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সে সময় উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। এরপর ছাত্রদল মাদ্রাসার বাইরে এবং ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান নিয়ে থাকেন।
এ সময় প্রায় দুই ঘণ্টার মতো সংঘর্ষ বন্ধ থাকলে মাদ্রাসার সামনের সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। সে সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঘটনার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা হলে ঢুকে শিবিরের নেতা–কর্মীদের মারধর করে হলের বেশ কয়েকটি রুমে তালা দেন। এরপর তাঁরা ছাত্রদল নেতা–কর্মীদের ধাওয়া দিয়ে হল থেকে বের করে দেন। পরে ছাত্রদল আবার দলবল নিয়ে এলে শিবিরের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়।

সে সময় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদল নেতা সাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবিরের নেতা–কর্মীরা হলের বেশ কয়েকটি কক্ষ দখল করে রেখেছেন। গতকাল রাতে তাঁরা বহিরাগত ব্যক্তিদের হলে এনে রাখেন। আজ শিবিরের নেতা–কর্মীরা ছাত্রদলের একটি রুম তালাবন্ধ করে রাখেন। এরপর ছাত্রদল বেশ কয়েকটি রুমে তালা লাগালে শিবিরের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের মারামারি শুরু হয়।
এরপর বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে মাদ্রাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষ ইট–পাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া দেয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই এলাকায় সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ছাত্রশিবিরের চারজনকে এবং ছাত্রদল ও যুবদলের দুজনকে মারধর করতে দেখা যায়।

দ্বিতীয় দফায় এই সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ সদস্যরা দুই পক্ষের মাঝে অবস্থান নেন। তবে তাঁদের সংখ্যা কম হওয়ায় সংঘর্ষ থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ে। এর মধ্যেই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা ওই এলাকা সরে যান।
তখন যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতাকর্মী আলিয়া মাদ্রাসার হলে প্রবেশ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন।