Image description

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের নির্বিচার গুলিতে সাতজন আন্দোলনকারী শহীদ হন। আহত হন দুই শতাধিক ছাত্র-জনতা।

 

অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অস্ত্রধারীদের বেশিরভাগই এখনো অধরা। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রও এখনো উদ্ধার হয়নি।

শুধু তাই নয়, হামলায় কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে।

 

হামলাকারীদের প্রকৃত সংখ্যা শতাধিক হলেও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণের ছবি ও ভিডিও থাকার পরও পুলিশের তালিকায় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে মাত্র পাঁচজনের নাম এসেছে।

ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে অস্ত্রধারী হিসেবে এলাকায় বহুল পরিচিত। তারপরও তাদের নাম পুলিশের তালিকায় আসেনি।

 

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে এমন অন্তত ৫৫ জনের নাম পাওয়া গেছে, যারা ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী নাসিম ও ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর অনুসারী।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট নিজাম হাজারী ও তার অনুসারীরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করেছিলেন। সেখানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়া ৩০ জন অস্ত্রধারীর নাম প্রকাশ করা হয়। এর বাইরে আরও শতাধিক ক্যাডার ছিলেন, যারা জেলার বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। পরিচয় শনাক্তসহ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।

পুলিশের ‘শুটার’ তালিকায় ফেনীর পাঁচজন হলেন জিয়া উদ্দিন বাবলু, মো. রেজাউল করিম নাদিম, করিমুল্লাহ বিকম ওরফে রেনছু করিম, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মাসুদ ও সাহিদুল ইসলাম। 

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছরে দলটির নেতাকর্মীদের নামে প্রায় ১০৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলন দমনে ওইসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাই পথে আনা অনেক অবৈধ অস্ত্রও সেদিন জুলাই সন্ত্রাসীদের হাতে দেখা গেছে। গত দুই বছরে এসব অস্ত্র উদ্ধারে খুব একটা অগ্রগতি নেই।

স্থানীয়দের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ফেনীতে হামলা ও গুলিবর্ষণে যুক্ত শতাধিক চিহ্নিত সশস্ত্র ক্যাডারসহ অংশ নিয়েছিলেন অন্তত ১০ হাজার আওয়ামী ক্যাডার। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সেদিন নিজাম হাজারীর ক্যাডারদের হাতে এম-১৬ রাইফেলও ছিল।

নিজাম হাজারী একসময় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের ‘ক্যাডার’ ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ২০০০ সালের ১৬ আগস্ট অস্ত্র আইনে ডবলমুরিং থানার একটি মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড হয় নিজাম হাজারীর। অস্ত্র মামলায় সাজা ভোগ করলেও তার নামও তালিকায় নেই। যদিও ৪ আগস্ট মহিপালে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলার সময় নিজাম হাজারীকে নেতৃত্ব দিতে দোখা গেছে। নিজাম হাজারী গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে পালান।

আরেক সংসদ সদস্য ফেনী-১ এর আলাউদ্দিন নাসিম একসময় স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার প্রটকল কর্মকর্তা ছিলেন। সে সুবাদে ফেনীর আওয়ামী রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেন। ৪ আগস্ট মহিপালে জনতার ওপর হামলায় নাসিমেরও প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে অভিযোগ ছাত্র-জনতার অভিযোগ। হামলার পরপরই তিনি নিজের ফেসবুকে আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রশংসা করে পোস্টও দিয়েছিলেন।  

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশ সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় প্রতিদিনই ফেনী পৌরসভায় নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও ক্যাডাররা সভা করতেন। আন্দোলন প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের জেলা-উপজেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং প্রতিটি পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের ৪ আগস্ট (২০২৪) হামলায় অংশ নিতে ফেনী শহরে উপস্থিত থাকতে বলেন নিজাম হাজারী। তাদের মধ্যে যাদের লাইসেন্স করা অস্ত্র ছিল সেগুলো এবং অন্যান্য অবৈধ অস্ত্র আগের দিনই জড়ো করা হয়।  

৪ আগস্ট সকালেও নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে ফেনী পৌরসভায় বৈঠক হয়। সেখান থেকে অস্ত্র বিতরণ ও হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঘটনার দিন কলেজ রোড, জেল রোডসহ প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে শহরের ট্রাংক রোড, শহীদুল্লা কায়সার সড়কে মহড়া দেয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। দুপুরের দিকে এসব সড়ক ধরে গুলি করতে করতে মহিপালের দিকে যান তারা। বেলা দেড়টার দিকে মহিপালে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা ভাগ ভাগ হয়ে মহাসড়কে জোহরের নামাজ পড়ছিলেন। এমন সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি শুরু করেন।

 

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ফেনী থেকে পাঠানো এসবির তালিকায় এদের কারও নামই রাখা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান,  সেদিন শটগান দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে দেখা গেছে- কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলুকে।

ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে ছিলেন জেলা সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নূর করিম জাবেদ, অর্ণব, রাকিব। পয়েন্ট টুটু বোর রাইফেল নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুল হকের (রিপন চেয়ারম্যান) সহচর আজগর ফকিরকে। হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে রিপন চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান করিম উল্লাহ, ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন মজুমদার, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির, দাগনভূঞা উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, পৌর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম (নাদিম), সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম (পিটু), জেলা যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ১৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সোহেল ওরফে ব্ল্যাক সোহেল, সোনাগাজী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (ভুট্টু), শর্শদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জানে আলম, ফেনী পৌর যুবলীগের সভাপতি রফিক ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বাবলু, পৌর যুবলীগ নেতা মোহন, নাহিয়ান ও সাব্বিরকে।  

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সেদিন ব্যবহৃত অস্ত্রের একটা বড় অংশের জোগানদাতা ছিলেন ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল। তাকেও সেদিনের ছবি-ভিডিওতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ফেনী পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুর রহমান, ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নূর নবী, শর্শদী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম সম্রাট, ফেনী পৌর ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবুল কালাম ওরফে গরু কালাম, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক কুদরত ই খুদা ইসহাক, সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বাদলকে গুলি করতে দেখা গেছে। আরও দেখা গেছে ফেনী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, ছাগলনাইয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফা ও দাগনভূঞা পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক খান,জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ মিলনকে।

এদিকে মহিপাল হত্যাকাণ্ডে যুক্ত এসব শুটারদের মধ্যে খোকন হাজারী, জিয়াউদ্দিন বাবলু, হারুন মজুমদার, দিদারুল কবির, রফিকুল ইসলাম, সাইফুর রহমান, শুসেন চন্দ্র শীল, নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীসহ অনেকেই এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রামে আত্মগোপনে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পালিয়ে থাকা নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়, এমন একাধিক রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে বসে নিজাম হাজারী ও আলাউদ্দিন নাসিম ফেনীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। দলের কর্মীদের মধ্যে যারা দেশে আছেন এবং আর্থিকভাবে ভালো নেই তাদের মাসে তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। ফেনী পৌরসভা ও ছয়টি উপজেলা থেকে এমন অন্তত দেড় হাজার মানুষের তালিকা করে টাকা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের বার্তা আদান-প্রদানের কিছু স্ক্রিনশট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেনী পৌর এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩০ জনকে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৪০ জনকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী এর সমন্বয় করছেন। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নূর করিম জাবেদ ও ফেনী পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন তাকে সহযোগিতা করছেন।

এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ফেনীর জুলাইযোদ্ধারা বলেন, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ২০২৪ এর ৪ আগস্ট প্রকাশ্য অস্ত্রধারীরা এখন পর্যন্ত আটক না হওয়া খুবই উদ্বেগের বিষয়।

 

ফেনী পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ও জুলাই অভ্যুত্থানের ২২ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, এখনো অস্ত্রধারীরা হুট হাট করে মিছিল বের করে, আর পুলিশ তামাশা দেখে। এতে করে আতঙ্ক বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।

জুলাই শহীদ ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মা অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার না হওয়ায় ছেলে হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কা জানান। ইশতিয়াক আহমদ শ্রাবণের মা ছেলে হত্যা মামলার দ্রুত চার্জশিট প্রদান, অস্ত্রধারীসহ সব অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. সাইফুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে তৎকালীন আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল, তাদের শনাক্ত করে পুলিশ ২৫ জনের একটি তালিকা করেছে। সে তালিকা ফেনী থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ৪ আগস্টের ঘটনার বিশ্লেষণ চলছে। অস্ত্র উদ্ধার ও বহনকারীদের আটকে পুলিশের ভূমিকা জিরো টলারেন্স।

সেদিনের ঘটনায় দায়েরকৃত ২২টি মামলায় ১ হাজার ১৯২ জন আসামি গ্রেপ্তার, ছয়টি হত্যা ও সাতটি হত্যাচেষ্টা মামলায় পুলিশ রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। একটি অস্ত্র উদ্ধারসহ আদালতে আটজনের স্বীকরোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে।