গর্ডন ব্রাউন
ক্ষমতা দখলের পর থেকে গত পাঁচ বছরে আফগান নারী ও কিশোরীদের ওপর তালেবানের দমন ও পীড়ন শুধু অব্যাহতই থাকেনি; বরং তা আরও নিষ্ঠুর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আফগান মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। আগামী সপ্তাহে (১৫ আগষ্ট) আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তী উপলক্ষে মঙ্গলবার ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক নিবন্ধে এই মন্তব্য করেছেন তিনি। ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্বে রয়েছেন গর্ডন ব্রাউন।
২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান । ব্রাউন স্মরণ করিয়ে দেন যে, দুই দশকের যুদ্ধে ১০ লক্ষেরও বেশি জোটসেনা মোতায়েন, সাড়ে তিন হাজারের বেশি সেনার মৃত্যু, প্রায় ২৩ হাজার আহত এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ের পরও আফগান নারীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষায়, 'ইতিহাস একদিন প্রশ্ন তুলবে এত ত্যাগের পরও কীভাবে তালিবান মেয়েদের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারল।' তিনি আরও বলেছেন, তালেবানরা একের পর এক ফরমান জারি করে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, সরকারি চাকরি, বেসরকারি সংস্থা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া নারীদের বাইরে ভ্রমণ কিংবা পার্ক, রেস্তোরাঁ সহ বহু জনসমাগমস্থলে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি আরও কয়েকটি নির্দেশনার মাধ্যমে নারীদের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত করা হয়েছে।
নিবন্ধে জুন মাসে আফগানিস্তানের হেরাতে 'আজাদি' স্লোগানে আয়োজিত নারী অধিকার আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেছেন ব্রাউন । মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ও কঠোর পোশাক বিধির বিরুদ্ধে আয়োজিত ওই বিক্ষোভে তালেবান বাহিনীর গুলিতে এক কিশোর সহ দু'জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহতও হন। তাঁর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মহলে এত বড় একটি ঘটনা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি, যতটা পাওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, তালেবান এখন এমন আইন প্রণয়ন শুরু করছে, যা শিশুবিবাহকেও কার্যত বৈধতা দিচ্ছে। পাশাপাশি গার্হস্থ্য সহিংসতার ক্ষেত্রেও স্বামীদের দায় মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে।জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, আফগান নারীদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য এখন 'জেন্ডার অ্যাপারথাইড' বা লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবৈষম্যের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। এমনকি সম্প্রতি এক ১৫ বছর বয়সী কিশোরীকে জোর করে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে অপহরণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তাকে ও তার মাকে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও উঠে এসেছে।
নিবন্ধে ব্রাউন আরও বলেছেন, শিশুবিবাহ কেবল সামাজিক রীতির ফল নয়। দারিদ্র্যতাও এর অন্যতম প্রধান কারণ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে বিশ্বে শিশুবিবাহের হার কমলেও এখনও প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ কিশোরীকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের কঠোর আইন এবং বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থা ও দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সঠিক নীতি গ্রহণ করলে শিশু বিবাহ রোধ করাও সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে হাজারের বেশি কিশোরী স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে এবং অল্প বয়সে বিয়ে এড়াতেও সক্ষম হয়েছে।
ব্রাউন আরও উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কিছু এলাকায় 'চাইল্ড ম্যারেজ ফ্রি জোন' গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে তরুণ তরুণীরা জোরপূর্বক বিয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। 'ওয়েডিং বাস্টার্স' নামে পরিচিত এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সহযোগিতা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। তাঁর মতে, তালিবান সবচেয়ে বেশি ভয় পায় শিক্ষিত নারীকেই। কারণ শিক্ষা মেয়েদের ক্ষমতায়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একই সঙ্গে শিক্ষা শিশুবিবাহ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়ও। বর্তমানে ইউনিসেফ ও 'এডিকেশন ক্যাননট ওয়েট' এর সহায়তায় গোপন বিদ্যালয়, অনলাইন ক্লাস এবং ব্যক্তিগত বাড়িতে পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে বহু আফগান কিশোরী এখনও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। নিবন্ধের শেষাংশে ব্রাউন জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের নতুন শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় দাতব্য সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির মাধ্যমে কিছু আফগান মেয়ের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বর্তমানে । তবে তিনি এটিকেও যথেষ্ট মনে করেন না। তাঁর প্রস্তাব, জোরপূর্বক বিয়ের ঝুঁকিতে থাকা আফগান মেয়েদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করতে হবে। যেখান থেকে বৃত্তি তুলে প্রয়োজনে দেশের বাইরেও তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে সহজেই। জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে নিজের প্রস্তুতির কথাও জানান ব্রাউন। তাঁর ভাষায়, স্বাধীনতা ও শিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে জীবন বাজি রাখা আফগান মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো আজ কেবল মানবিক দায়িত্বই নয় তা সমগ্র বিশ্বের নৈতিক অঙ্গীকারও। লেখক পরিচিতি: যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন