প্রতিমন্ত্রী একজন নারীর সঙ্গে যাই করেছেন, এটা তাদের দুইজনের ব্যক্তিগত ব্যাপার। যতক্ষন পর্যন্ত দুইজনের কেউ অভিযোগ না করছে, এতে পাবলিক ইন্টারেস্ট বা সংবাদ উপাদান নেই। প্রতিমন্ত্রীর ওই নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ে করবেন, এমন কথাও বলেছিলেন। বিয়ে না করায় ওই নারী ছবি ভিডিও ফাঁস করে দিয়েছেন। ঘটনা এতটুকুই।
বাংলাদেশের 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০' এর ৯(খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৬ বছরের বেশি বয়সী আস্থাভাজন কোনো নারীর সম্মতিতে তার সঙ্গে যৌনকর্ম করেন; পরে বিয়ে না করলে ৭ বছর জেল হবে।
প্রথমত, এটা একটা অপ্রয়োজনীয় আইন। কারণ ১৬ বছরের বেশি বয়সী কেউ একজন একবার কনসেন্ট দিলে, পরে আবার এটা নিয়ে অভিযোগ তোলার কী আছে? ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে, প্রেমের সম্পর্কে যৌনমিলন হলে এটাকে নিপীড়ন বা ধর্ষণ বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশেও এই বিধান হওয়া উচিত। কারণ এই আইনের সুযোগ নিয়ে পরবর্তীতে মামলা করা হচ্ছে। এগুলো সব হয়রানীমূলক মামলা।
২.
প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গের ওই নারী যদি আইনের ৯(খ) কাজে লাগিয়ে মামলা করতে চান, করতে পারেন। কিন্তু পর্নোগ্রাফি আইন অনুযায়ী ওই নারী নিজেই অপরাধী। আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী, গোপনে ব্যক্তিগত ভিডিও ধারন এবং তা ছড়িয়ে দিলে ৭ বছর কারাদন্ড হবে। আর ভিডিও ইউজ করে ব্ল্যাকমেইল করলে আরও ৫ বছর সাজা হবে।
তো যতক্ষণ পর্যন্ত ওই নারী প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিয়ের আশ্বাসে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ প্রকাশ্যে না আনছে বা মামলা না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের কোনো আইন লঙ্ঘন করেননি।
আর ওই নারী এই অভিযোগ আনলে বা না আনলেও, তাঁর বিরুদ্ধে আগে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা উচিত। ব্যক্তিগত গোপনীয় লঙ্ঘন ও এটাকে ইউজ করে বিয়ের চাপ দেওয়ায়।
৩.
এবার আসেন মিডিয়ার নিউজ হওয়া নিয়ে। গতকাল অন্তত ১০টা সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করে, প্রতিমন্ত্রীর ভিডিওটি ফেক, এআই জেনারেটেড ব্লা ব্লা। কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে নয়, নিজেরা রিপোর্ট করেছে। এসব রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'শিবির মিডয়া সেল' থেকে ভিডিও প্রচার করেছে।
ভিডিও আসল, এটা সমস্যা না। সমস্যা হল মিডিয়ার চিয়ার লিডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। ফকিন্নির বাচ্চার মত লাফিয়ে লাফিয়ে ভিডিওকে ফেইক আখ্যা দিয়ে ফেইক নিউজ প্রচার করেছে। প্রথমত, এই ভিডিও কোনো নিউজ আইটেমই না।
কিন্তু এই ফকিন্নির ভিডিওকে ফেইক দাবি করায় ফ্যাক্টচেকাররা এগিয়ে আসে। চেক করে বলে ভিডিওটি আসল। অথচ এইসব ভিডিও ছবি ওদের কাছে আরও চারদিন আগে থেকেই ছিল। ফকিন্নি মিডিয়া ফাও দালালি করে ফেইক নিউজ প্রচার করায়, তারা ফ্যাক্টচেক করেছে। ফকিন্নি মিডিয়া ফেইক বলে প্রচার না চালালে, ফ্যাক্টচেক হত না।
৪.
আজ জামায়াতের এক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটা হল, গত ২৪ মার্চ ওই নারীর সঙ্গে বিয়ের আশ্বাসে শারীরিক সম্পর্কে নারী অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে ১৮ মে জোর গর্ভপাত করান ওই কর্মী। ভাই দুনিয়ার কোন জায়গায় প্রযুক্তিতে যৌন মিলনের ৭ সপ্তাহের মধ্যে প্রেগন্যান্সি বোঝা যায়? যথারীতি এই মামলা থানা পুলিশ নেয়নি। আদালতে দিয়ে এজাহার দিয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড়। ওই নারী বলছেন, তিনি বিয়ে করতে চান। যে আপনাকে ধর্ষণ করল, তাকে বিয়ে করবেন কেনো- এই প্রশ্নটা নারীকে করা উচিত।
কয়েকদিন চট্টগ্রামে এনসিপির একনেতার বিরুদ্ধে একই রকম এটা মামলা হয়েছে। দেশের প্রাচীনতম অনলাইন সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করেছে 'ধর্ষণ মামলায় এনসিপি নেতা কারাগারে'। খবরটি পড়ে দেখি, ঘটনা হল প্রেমিকা মামলা করেছে বিয়ে না করায়।
অথচ এই সংবাদমাধ্যমের এই টাইপের যত নিউজ আছে, ওইগুলোর শিরোনাম অন্যরকম। যেমন সিমিলার টাইপের সর্বশেষ নিউজের শিরোনাম হল, 'বিয়ে আশ্বাসে শারীরিক সম্পর্ক, পুলিশ কনস্টেবল কারাগারে'। কিন্তু এনসিপির ক্ষেত্রে শিরোনাম, 'ধর্ষণ মামলায় এনসিপি নেতা কারাগারে'। মানে এনসিপিকে ডিফেইম করতে শব্দের খেলা।
জামায়াত, এনসিপিকে ক্রিকিট করাতে গিয়ে অপসাংবাদিকা হচ্ছে, সাংবাদিকতা মরে যাচ্ছে, এটা কী মিডিয়া বুঝতে পারছে।
৫.
গত সপ্তাহে জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরালের পর মেইনস্ট্রিমের দুই তিনটি বাদে সব মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পরে। গোপনে ধারন করা ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে। যেটা বেআইনী এবং ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রাচীনতম অনলাইন তো চার পাঁচবার এই ছবি প্রকাশ করে। যেটা তাদের ২২ বছরের ইতিহাসে করেনি। কেনো করেছে? কারণ তার লিবারেলিজমের সঙ্গে সংজ্ঞা তাতে জামায়াত পরে না। এই চিন্তা যখন থাকে, তখন ওইটা আর মিডিয়া থাকে না।
আমার আর্গুমেন্ট সিম্পল ছিল। যে নারীর সঙ্গে জামায়াত এমপির নারীর ঘটনা, তার কোনো অভিযোগ নেই। তার পরিবারের অভিযোগ নেই। বরং তারা নিজেদের বিবাহিত পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে দুইজন নারী পুরুষ যদি দুইজন সাক্ষী হাজির করে বলে, তারা বিবাহিত, তাহলে তারা বিবাহিত। আর প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বিয়ের নিবন্ধন কবে হয়েছে, আদৌ হয়েছে কিনা, এগুলো কিছুই দেখা হবে না আইনে। প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ না থাকলে দ্বিতীয় বিয়ে ফৌজদারি অপরাধ না। সালিশ পরিষদের অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তা বৈধ।
জামায়াত এমপির বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ আনা হচ্ছে, তাদের কারো লোকাস স্ট্যান্ডি নাই। আর নৈতিকতা তো যার যার তার তার।
ওই ঘটনার কালপ্রিট এমপির ড্রাইভার। যে ভিডিও গোপনে ধারনা করেছিল ১০ লাখ টাকার জন্য। বকেয়া ৭ লাখ টাকা না পেয়ে ভিডিও লিক করে দেয়অ তাঁর যাওয়ার কথা জেলে। কিন্তু মিডিয়া তার ইন্টারভিউ ছাপাচ্ছে হুইসেল ব্লেয়ার ভাইব দিয়ে! দেশের সবচেয়ে বড় মিডিয়া এই নির্লজ্জ কাজ দেখে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে।
মিডিয়া ড্রাইভার বক্তব্য ছাপাচ্ছে, 'ওই মেয়ে, তার বাবা এমপির টাকার লোভে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়। সে মামা হয়ে সহ্য করতে না পারে প্রতিবাদ ফাঁস করে দিয়েছে। " কিন্তু সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করছে, মেয়ে ও বেডা রাজি থাকলে চোদানির পোয়া তুই কে? তুই কেন টাকা নিয়েছিস? মেয়ে ও তার বাপ টাকা পেয়েছে, তুই না পেয়ে এগুলো করছিস কেনো? এটা না করে বরং প্ল্যাটফর্ম দেওয়া হচ্ছে সেই এমপিকে ডিফেইম করতে।
প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তা না করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং আইনকে সম্মাণ করার যে অবস্থান মিডিয়া নিয়েছে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমি জানি এই অবস্থান আইন বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান থেকে নয়। এটা হল, প্রতিমন্ত্রী এবং তার দলের ক্ষমতার কারণে সমীহ।
স্পষ্ট মনে আছে, কয়েক বছর আগে প্রতিমন্ত্রীর দলের এক নেতার অডিও ভাইরাল হওয়ার পর, সেটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মিডিয়া। কারণ, তখন তাদের ক্ষমতা ছিল না।
৫.
দেখে বমি করার মত ঘটনা হল, যারা নিজেদের প্রতিগতিশীল লিবারেল বলে দাবি করেন, তারা জামায়াত এমপির ভিডিওর পর লিখে ভরে ফেলেছেন। একেকজন দুই তিনটা করে কলাম ফেসবুক পোস্ট লিখেছেন। সেক্সটরশন অনৈতিক লিখে লিখে ভরে ফেলেছে।
প্রতিমন্ত্রী প্রতি তা না করে তারা ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু ভালো কাজটি শুভবুদ্ধি থেকে নয়। বরং ক্ষমতাকে তোষণ করে চলার নীতি থেকে করেছেন। জামায়াত এমপির সময় ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনা থেকে।
এই লোকেরা কিন্তু সেই অডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এখনও পড়ত, কিন্তু সকল সময়ে বিরোধী দলের বিরোধিতায় দায়িত্বে থাকায় পারছে না।
-রাজীব আহম্মদ,
সাংবাদিক, সমকাল