Image description

বিমানবন্দর থেকে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) স্মার্টকার্ড হাতে নিয়েই উড়োজাহাজে ওঠেন। বিমানবন্দরে কোনো বাধা নেই। গন্তব্য দেশের দূতাবাসও ভিসা দিয়েছে। আছে নিয়োগপত্রও। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে, ঋণ করে, সুদে টাকা এনে বিদেশের পথে পা বাড়ান তারা। কিন্তু বিমান থেকে নামার পরই বদলে যায় পুরো গল্প।

বিমানবন্দর থেকে যে কোম্পানিতে চাকরির কথা ছিল, সেখানে নেওয়া হয় না। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন না খেয়ে থাকতে হয়। পরে বাধ্য করা হয় অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে। কোথাও বেতন নেই, কোথাও ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ, কোথাও নির্যাতন। অনেককে আবার অন্য দেশে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কেউ ফিরে আসেন লাশ হয়ে, কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, আর কেউ বছরের পর বছর দেশে ফিরতেই পারেন না। বিশ্বজুড়ে যখন প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত আধুনিক সভ্যতা, ঠিক তখনই তার সমান্তরালে দ্রুতগতিতে ডালপালা মেলছে মানব ইতিহাস ও আধুনিক যুগের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়— ‘মানব পাচার’ বা ‘আধুনিক দাসত্ব’। এমনই এক বাস্তবতায় আজ ৩০ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।

ইমরানদের স্বপ্ন চুরমার হয় যেভাবে: নারায়ণগঞ্জের তরুণ ইমরান হোসেন। পেটের দায়ে একটু ভালো থাকার আশায় ধারদেনা করে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে নিজের সহায়-সম্বল তুলে দেন এক দালালের হাতে। বিদেশেও পাড়ি জমান। তবে স্বপ্নের দেশে ইতালি নয়; মানব পাচারচক্র তাকে কুয়েত হয়ে মিশর, তার পর লিবিয়া নিয়ে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এরপর সেখানে দীর্ঘদিন আটকা থেকে বাড়ির জমিজমা বিক্রি করে ২২ লাখ টাকায় মুক্তি পান। ছাড়া পেয়েই আবার আটক হন স্থানীয় পুলিশের কাছে। সেখানে চার মাস জেলে খাটার পরে মেলে মুক্তি। একইভাবে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে দেড় বছর লিবিয়ার মাফিয়াদের কাছে আটক থাকেন মো. মাসুম মোল্লা। পরে ৪০ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান। এই মাসুম কিংবা ইমরানই নন; একইভাবে লিবিয়ার মাফিয়াদের হাতে আটকা ছিলেন গাজীপুরের আব্দুর রহমান, মুন্সীগঞ্জের রিপন সিকদার, ফরিদপুরের সুমন শেখ, রিপন ফকির, আলামিন মাতব্বর, টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ মতিউর রহমান ও পাবনার মোহাম্মদ খোকন মোল্লাসহ অনেকেই।

চাকরির প্রলোভন থেকে সাইবার দাসত্ব: অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই গত কয়েক বছরে নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সাইবার স্ক্যাম। মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনে যেমন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশের অনেক মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়ে সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, বিদেশে চাকরির কথা বলে নেওয়া হলেও তাদের ৯৮ শতাংশ কোনো চাকরি পাননি। বরং তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতিমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ এতে রাজি না হলে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাওয়া কিংবা সাইবার স্ক্যামের ঘটনায় এখন পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে বিভিন্ন গ্রুপ খোলা হচ্ছে। আবার শতাধিক ফেসবুক গ্রুপে সাগরপথে ইতালিতে পৌঁছানো নৌকার ছবি ও যোগাযোগ নম্বর দিয়ে অন্যদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে চাকরির নানা প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। শুধু প্রলোভন বা প্রতারণা নয়, জোর করে বন্দি করে অনেককে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ কেন্দ্রকে বলা হচ্ছে স্ক্যাম সেন্টার। এসব সেন্টারে নতুন ধরনের এক দাসত্ব তৈরি হয়েছে।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কোনো চাকরি পাননি। অনেককে স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছে। কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে এ বছরের জুন মাসেই সেখান থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী দেশে ফিরেছেন। ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তারা কোনো চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ বলেছেন, জোর করে প্রতারণা বা স্ক্যামের কাজে তাদের যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না। ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ২৭ শতাংশ ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে এবং কেউ কেউ ভ্রমণ ভিসায় কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন। এরপর সেখানে থাকা কিছু বাংলাদেশি নাগরিক তাদের চীনা-নিয়ন্ত্রিত স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেন। এক ভুক্তভোগী জানান, সেখানে তার পরিচয় ছিল একটি কোড। বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে রওনা হওয়ার আগে তাকে একটি কোডওয়ার্ড মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয়, ইমিগ্রেশনে নিজের নাম নয়; সেই কোড বলতে হবে।

তথ্য বলছে, এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হয়।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘সাইবার স্ক্যাম এখন মানব পাচারের ভয়াবহ এক রূপ। কম্পিউটার অপারেটর, কলসেন্টার এক্সিকিউটিভ, কাস্টমার সার্ভিসসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে নিয়োগের প্রলোভন দেখানো হয়। পরে চাকরিপ্রার্থীদের স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়।’

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশিরা:

ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। এই পথটি সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট নামে পরিচিত। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। এভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর পথে নির্যাতন, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকে রাখার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় আটক হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে এভাবে লিবিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করছে যে দেশগুলোর মানুষ, গত বছরের মতো এবারও সেই তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। অবশ্য এবারই প্রথম নয়; কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ এই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তবে ২০২৬ সালে এসে ইতালির পাশাপাশি সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের দিক দিয়েও বাংলাদেশ এখন শীর্ষে রয়েছে।

এ বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের। ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে রওনা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভেসে ছিল। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এর পরও এমন মৃত্যুযাত্রা থামেনি।

ব্র্যাকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি এভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি। এভাবে যারা ইউরোপে যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বাংলাদেশের ১০-১২টি জেলার মানুষ এভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য মরিয়া।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘বিদেশে কাজ বা শ্রম অভিবাসনের নামে এই মানব পাচার অত্যন্ত ভয়াবহ সমস্যা। পাচারকারীরা এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কিন্তু সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে রয়েছে। আবার পাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোরও যথাযথ বিচার হচ্ছে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

রাশিয়া হয়ে যুদ্ধে বাংলাদেশিরা: বাংলাদেশ থেকে কেবল সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা বা সাইবার স্ক্যামের শিকার হওয়ার ঘটনাই ঘটছে না; কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায়ও সেখানে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে থাকা কিছু এজেন্সি ও দালালচক্র নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা কারখানার চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়, যার অর্থ তারা বুঝতে পারেন না। এরপর কয়েক সপ্তাহের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক তরুণের পরিবার জানিয়েছে, তাকে ওয়েল্ডারের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় এবং পরে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর আসে।

২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ক্রমাগত নতুন সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন, ইউরোপে কাজের প্রলোভন কিংবা রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাসে যেমন অনেক বাংলাদেশি সেখানে গেছেন, তেমনি আবার কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে কাজ না দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘ফরটিফাই রাইটস’ ও ইউক্রেনভিত্তিক ‘ট্রুথ হাউন্ডস’-এর যৌথ তদন্তেও এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। এই যুদ্ধে এরই মধ্যে প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়; নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত, কেনিয়া এবং বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের নাগরিকদেরও একই কৌশলে রাশিয়ার যুদ্ধে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটিও তদন্ত শুরু করেছে। কাজের নামে নারী পাচার বাড়ছে: বিদেশে পোশাক কারখানা, গৃহকর্মী বা বিউটি পার্লারে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক নারীকে জোরপূর্বক ডান্স ক্লাব ও যৌন ব্যবসায় যুক্ত করার তথ্য আসছে প্রায়ই। বিশেষ করে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ ভিসায় নারী পাঠিয়ে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে পাঠানোর পরও অনেক নারীকে জোরপূর্বক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এমনই একজন শান্তা আক্তার (ছদ্মনাম)। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারান পটুয়াখালীর শান্তা। বিয়ের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় প্রায় দুই বছর আগে তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে চারবার হাতবদল ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। সম্প্রতি তিনি একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিজের জীবন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে শান্তার।

সাদিয়া আক্তার (ছদ্মনাম) নামে এক ভুক্তভোগী জানান, গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে তিনি মানব পাচারের শিকার হন। সেখানে তাকে একটি ক্লাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌন পেশায় যুক্ত করা হয়। আট মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হতে পারলেও মিথ্যা অভিযোগে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের এক বিধবা তার ১৭ বছর বয়সী কিশোরী কন্যাকে দুবাইয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের প্রলোভনে বিদেশে পাঠান। সেখানে গিয়ে ওই মেয়ে নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়। মেয়ের ফোন পেয়ে ওই নারী থানায় অভিযোগ করেন এবং পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তা নেন। র্যাব অভিযুক্ত দালালদের গ্রেপ্তার করলেও নানা চাপের কারণে মামলাটি জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া চলছে।

বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচার: বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে রোহিঙ্গাদের পাচারও থেমে নেই। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই চার বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। সে সময় মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে একাধিক গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর প্রায় দুই বছর মানব পাচারের প্রবণতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর আবারও মানব পাচারের প্রবণতা বেড়ে যায়। তথ্য বলছে, বিয়ে ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এখন রোহিঙ্গাদের সমুদ্র উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশিদেরও মালয়েশিয়ায় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হচ্ছে। গত আট বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। এসব ঘটনায় শতাধিক মামলা দায়ের হলেও পাচার বন্ধ হয়নি। বরং মানব পাচারের জন্য লোক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে টেকনাফে নিয়মিত অপহরণের ঘটনা ঘটছে।

মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে হোয়াইক্যং, হ্নীলা, মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া, টেকনাফ সদর এবং সাবরাংয়ের শাহপরীর দ্বীপ গ্রাম। গত তিন বছরে টেকনাফে তিন শতাধিক মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। অনেকে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসতে পারলেও পরে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপহরণের পর সাগরপথে মানব পাচারের শিকারদের একজন টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের। এক সময় মাছ শিকার করেই চলত তার সংসার। কিন্তু চার বছর আগে অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি হওয়ার পর তার জীবন বদলে যায়। সাবের বলেন, ‘হাত-পা বেঁধে চোখ ঢেকে আমাকে শামলাপুরের একটি পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন দিন আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে মেরিন ড্রাইভ উপকূল থেকে ছোট নৌকায় করে গভীর সাগরে নিয়ে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ মানুষ গাদাগাদি করে ছিল। এরপর মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়।’

চার বছর পর, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দেশে ফেরেন সাবের। তবে নির্যাতনের আঘাতে তার মাথা ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না। কষ্টে চলছে তার সংসার।

মানব পাচারের মামলায় বিচারে ধীরগতি: বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কত লোক মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের শিকার হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কোনো সংস্থার কাছেই। তবে প্রতি বছর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন জেলখানা, বন্দিশালা বা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে ডিপোর্টি হিসেবে ফিরছেন। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সময়ে এভাবে সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ফিরেছেন। এছাড়া সাগরপথে বিদেশে যেতে গিয়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জেলখানায় বন্দি আছেন আরও অসংখ্য বাংলাদেশি। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে সরকার ২০১২ সালে আইন প্রণয়ন করার পর থেকে মানব পাচার আইনে নিয়মিত মামলা হলেও অধিকাংশ মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। আবার যেসব মামলার বিচার শেষ হচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রেও অনেক আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচারসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি মামলা এখনো তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে নতুন করে ৭১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬টি, মার্চে ১১০টি, এপ্রিলে ১৩০টি এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। এই সময়ে মাত্র ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালে বা চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তথ্য পাওয়া যায়নি; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

এদিকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘অভিবাসী চোরাচালান’-সংক্রান্ত অপরাধকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এই আইনেও একক ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে মানুষ বেকার। তারা তাদের পরিবারকে ভালো রাখতে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এক্ষেত্রে এই এজেন্সির যে তদারক সংস্থা আছে, তাদের কঠোর হতে হবে। অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পেলেই তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দিতে হবে।’