মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দুই দফায় উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত। দেশের পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার বন্যার ক্ষত শুকাতে না শুকাতে চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় দেশের হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা।
হাওরের বন্যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় যে ধাক্কা দিয়েছিল, চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তলিয়ে যাওয়া ফসল, ভেসে যাওয়া হাজারো মাছের ঘের আর গবাদি পশুর ক্ষতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
এক লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হওয়ায় ঝুঁকিতে আউশ ও আমন : চলতি মাসে চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে এই বিভাগের জেলাগুলোসহ মোট ৪৩ জেলার কৃষি ক্ষতির মুখে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি বানের পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সংকটে পড়েন পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন প্রান্তিক কৃষক।
চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আউশ ও আমনের চাষাবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতি : চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ৩৫ হাজার ৫০০ পুকুর ও চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ায় অনেক চাষি এখন নিঃস্ব। মা মাছের হ্যাচারি প্লাবিত হওয়ায় রুই মাছের লাখ লাখ পোনা নষ্ট হয়েছে। চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডেইরি ও পোলট্রি খামারে গবাদি পশু ও কয়েক লাখ মুরগি মারা গেছে এবং দুধের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। সরকারি হিসাবে এই খাতে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. তারেক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্যার পর গবাদি পশুর মধ্যে সাধারণত বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উপপরিচালক বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো গোখাদ্যের অভাব। অনেক এলাকার ঘাসের মাঠ, খড় ও পশুখাদ্যের মজুদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামারিরা বেশ সংকটে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে গোখাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিটি জেলায় মানুষের বিভিন্ন সহায়তার পাশাপাশি পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার গোখাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. কে বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন শুধু ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, জরুরি ভিত্তিতে গোখাদ্য, ওষুধ ও টিকাদান জোরদার করতে হবে।
মাঠে নানা চ্যালেঞ্জ : কৃষি ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একাধিক মূল সংকট চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, আমন মৌসুমের শেষ মুহূর্তে নতুন বীজতলা তৈরি করা অসম্ভব। অন্য জেলা থেকে চারা এনে সরবরাহ করা না গেলে বিশাল জমি অনাবাদি থেকে যাবে। কৃষক-খামারিরা ব্যাংক বা এনজিওর ঋণে বিনিয়োগ করেছিলেন। পুঁজি হারিয়ে তাঁরা এখন নিঃস্ব। তাঁদের বিষয়টি ভাবতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, বন্যায় আউশের প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষতি হলে উৎপাদন অন্তত সাড়ে চার লাখ টন কমে যেতে পারে। হাওর অঞ্চলের আগের ক্ষতির সঙ্গে এই ক্ষতি যোগ হলে দেশে মোট চালের ঘাটতি ছয় থেকে সাত লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে চালের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর নজরদারি জরুরি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বন্যায় সবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। শীতকালীন সবজির আবাদ সম্প্রসারণ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে।
সম্প্রতি বন্যাকবলিক এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। সরকারের পক্ষে একবারে সব ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব না হলেও কৃষকদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বীজ, সার, গবাদি পশুর ভ্যাকসিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।