মোটামুটি ৭৩/৭৪ সালের দিকে চারপাশকে বোঝার মতো বুদ্ধি হয়ে গেছে। তখন গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন আমাদের পাশের বাড়ির এক দাদা। আরবি খুতবার শেষদিকের একটি বাক্যে ইমাম সাহেব পাকিস্তানের নামটি উচ্চারণ করতেন। এর পরপরই ইয়া ফিলিস্তিন, ইয়া কাশ্মীর—এই দুটো শব্দও উচ্চারণ করতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ যেহেতু এগুলোর অর্থ বুঝতেন না। তাই ইমাম সাহেব এগুলো পড়লেও কোনো বালামুসিবতে পড়েননি!
পরে বুঝেছি ইমাম সাহেব পাকিস্তান আমলে যে খুতবার কিতাবটি কিনেছিলেন, সেখান থেকেই খুতবাটি পড়তেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পরেও পাকিস্তানের কল্যাণ কামনায় প্রতি শুক্রবার দোয়া করে গেছেন—বুঝে বা না বুঝে!
তখন চতুর্দিকে রক্ষীবাহিনী তথা ফজলু কমান্ডারদের দুর্দান্ত প্রতাপ। ভয়ংকর সত্যটি হলো—যিনি ১০০ মাইল দূর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারির আওয়াজ শুনতেন—সেই তিনি একই বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যেই অবস্থান করছিলেন! অগত্যা আমাদের ইমাম সাহেব যদি বাংলায় এই খুতবা পড়তেন—তবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ফজলু কমান্ডারের কাছে এই খবর পৌঁছাতে সময় লাগত না।
এই ফজলু কমান্ডার বর্তমান সংসদে দাঁড়িয়ে কথিত পুলিশ হত্যার বিচার চাওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন! এর একটি সুন্দর জবাব অবশ্য আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় দিয়েছেন! তিনি বলেছেন, জুলাইয়ে গণপ্রতিরোধের মুখে নিহত হওয়া পুলিশের যদি বিচার করতে হয়, তবে ৭১-এ মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা রাজাকার হত্যার বিচারও করতে হবে। খুবই যৌক্তিক কথা—এই কথাগুলো আমরা কিছুদিন ধরে বলে আসছি। সেই কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের মুখে শুনে যারপরনাই ভালো লেগেছে! মন্ত্রী মহোদয়গণ, এভাবে ফজলু কমান্ডার ও নিলুফার মনিদের ব্যূহ অতিক্রম করে পাবলিকের কথাগুলো শুনতে চেষ্টা করুন!
গত কয়েক সপ্তাহে লক্ষ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের কিছু আওয়ামীপন্থি গণমাধ্যম (মোজা বাবুর ৭১ টিভি, সন্তোষ শর্মার কালবেলা প্রমুখ) বেলুচিস্তানের ঘটনাবলিকে অস্বাভাবিক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। কখনো শিরোনামে, কখনো টকশোতে, কখনো বিশ্লেষণের মোড়কে। দেখে মনে হতে পারে, বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎই যেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্বেগ হয়ে পড়েছে! এরাই আবার ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের খবরকে পারলে ব্ল্যাকআউট করে দিচ্ছে! এই ৭১ টিভি ও কালবেলারা কখনোই কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের নিয়ে কোনো কথা বলে না, শিখদের স্বাধীন খালিস্তান নিয়ে কোনো কথা লেখে না, সেভেন সিস্টার্সের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কোনো কথা বলে না, যদিও বেলুচিস্তানের চেয়েও সেখানকার মানুষের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরো তীব্র এবং আরো সংকটপূর্ণ!
প্রশ্ন হলো—কেন?
একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা ইন্ডিয়ার দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক বয়ানের অংশ। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংকটকে বড় করে দেখানো ইন্ডিয়ার গণমাধ্যমের কাছে রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ কেন এই কাজটি করছে?
আন্তর্জাতিক রাজনীতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি হওয়া উচিত তথ্য, ইতিহাস, আমাদের নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং তার আলোকে অন্যদের অবস্থানের সাপেক্ষে!
বেলুচিস্তান একটি জটিল ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদ, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদ, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলেই বাস্তবতা গড়ে উঠেছে। এখানে যদি আমরা কথা বলতে চাই, তবে তা হতে হবে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের আলোকে!
বেলুচিস্তানের জনগণকে বরং আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীরা এখন প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন যে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে নয়—বরং পাকিস্তানকে ভাঙতেই তার দাদি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এই সহযোগিতা করেছিলেন! এরপর আমাদের জটিল ও ভয়ানক কৃতজ্ঞতাবোধে আটকে ৫৫ বছর যেভাবে শোষণ ও নির্যাতন করেছে, সেই জাজ্বল্যমান ইতিহাস থেকেও তাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত! দেখলাম, সেখানেও এক মহিলাকে শেখ মজিব বানানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে!
পাকিস্তানের শাসকরা এবং ইন্টেলেকচুয়াল সমাজ বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে লেসন নিতে পারেন। বেলুচিস্তান জনগণের সত্যিকারের কনসার্নগুলো যথাযথ অ্যাড্রেস করুন। দোয়া করি, ভুট্টো, ইয়াহিয়া খান ও টিক্কা খানের মতো হঠকারী নেতৃত্ব যেন বেলুচিস্তানকে ঘিরে গড়ে না ওঠে! বেলুচিস্তান যেন কোনোভাবেই আরেক বাংলাদেশ না হয়—সেই কামনা করি!
মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষ মানুষদের নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প পশ্চিমা মিডিয়ায় ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে একটা গল্প হলো, সেখানকার কোনো মহিলা হোস্টেলে আগুন লাগলে আটকে পড়া মেয়েদের উদ্ধার করতে পুরুষ ফাইয়ার ফাইটাররা প্রবেশ করতে পারবেন না। অর্থাৎ আগুনে পুড়ে মরুক, তবু পরপুরুষের স্পর্শ যেন মেয়েদের শরীরে না লাগে। বাঙালি এলিট সুশীলরা তাদের বিশেষ চেতনার ফতোয়া দিয়ে আমাদের এমনভাবেই ভূরাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখতে চান! ইন্ডিয়া যদি আমাদের রংপুর বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিভাগ দখল করার প্রকাশ্য হুমকিও দেয়, তবু পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির স্মরণ বা তাদের নাম নেওয়া মহাপাপ হবে। এ কারণেই চেতনার এক বরকন্দাজ পাকিস্তানের নাম নিলে কোমলমতি শিশুদের দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন!
এ কারণেই সংখ্যা অনেক গুণ বাড়িয়ে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বয়ানটি আমাদের গেলানো হয়েছে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান অ্যাটমিক বোমা খেয়েও জাপান আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে—আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে তা করতে পারব না—বাঙালির জন্য এটি কবিরা গোনাহ!
রনিদের চোখে আমরা কেন পাকিস্তানি উজবুক?
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে যে কয়টি গিরগিটি জাতীয় প্রাণী রয়েছে, এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি অন্যতম।
তিনি কখনো কাদের মোল্লার উস্তাভাজার গল্প শুনিয়ে জামায়াতের অন্তরের অন্তস্তলে ঢুকে পড়েন, কখনো মাওলানা সাঈদীর সুর অনুকরণ করে সংসদে কথা বলে তৌহিদী জনতাকে সিক্ত করেন। মাঝখানে বিএনপির টিকিটে সংসদ নির্বাচন করেছেন! এখন আবার আওয়ামী লীগের অন্যতম উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন!
ইদাণীং কয়েকজন কথিত ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ এবং হাইব্রিড ও অরিজিনাল ব্রিডের কয়েকজন বিএনপি নেতা-নেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক বানানোর কাজে হাত দিয়েছেন। জুলাই শহীদ আবু সাঈদ এবং হাদিকে দেশের জনগণ ভুলে যাচ্ছে, এ রকম একটা প্রচারণা শুরু করেছিলেন। তার বলার স্টাইল দেখে মনে হলো মি. আজাজিল একধরনের ওয়াসওয়াসা শুরু করেছেন! সিনিয়র সাংবাদিক নামধারী আরো কয়েকজনের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হলো—এই কজনকে দেখা মাত্রই জাতিকে সুরা নাসটি পড়া উচিত। কারণ ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, হাজার হাজার মানুষের খুনি, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তছরুপকারী এক সাইকোপ্যাথ মহিলাকে ফিরিয়ে আনার ফন্দি এরা শুরু করেছেন!
নতুন ভার্সনের মি. আজাজিলদের ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে সচেতন করায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আমাকে ‘পাকিস্তানি উজবুক’ বলে অভিহিত করেন।
মুজতবা আলী পণ্ডিত মশায় গল্পের পণ্ডিতজি যে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তার ছাত্রের দিকে তাকাতেন—এর চেয়েও হেয়দৃষ্টিতে আমার দিকে বোধ হয় তাকালেন। আমি এত নগণ্য যে আমার নামটিও শুনেননি। কিন্তু নাম না শোনলেও আমি যে ‘পাকিস্তানি উজবুক’ সেটি জেনে গেছেন। অথচ নয়া দিগন্তে যে জায়গায় আমার উপসম্পাদকীয় কলাম ছাপা হতো, সেই একই জায়গায় তার কলামটিও ছাপা হতো! আমার তখনকার কোনো কোনো লেখার প্রশংসাও করেছিলেন!
যায়যায়দিন শফিক রেহমানের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ায় আমরা কয়েকজন তখন অনেকটা বাস্তুচ্যুত রিফিউজির মতো নয়া দিগন্তে লেখা শুরু করেছি! এর মধ্যে শফিক রেহমান নিজে এবং বিবিসির সিরাজুর রহমানও ছিলেন। সিরাজুর রহমান একবার কষ্ট নিয়ে আমাকে বলেছিলেন—দীর্ঘদিন বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার পরেও, বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিবিসি বাংলা বিভাগ থেকে একটা ভূমিকা থাকার পরেও দেশের কথিত এলিট বা ব্রাহ্মণ শ্রেণির কাগজগুলোয় আমার লেখা ছাপায় না!
নয়া দিগন্তে আমরা যে কারণে রিফিউজি হয়েছিলাম, সেখানে আরেকটু ভিন্ন কারণে রিফিউজি হয়েছিল কাদের সিদ্দিকী ও গোলাম মাওলা রনি। এই কারণটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক! জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি ঘরানার রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো আওয়ামী বলয় থেকে হঠাৎ খসে পড়া রাজনৈতিক তারকাদের জন্য আকর্ষণীয় রিফিউজ সেন্টার হিসেবে কাজ করে! আরেকটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায় যে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি যেমন আদর্শ রিফিউজ—তেমনি জামায়াতের মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি!
আওয়ামী লীগ থেকে খসে পড়ার পর ড. কামাল হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রমুখ নেতা ২০১৮ সালে এসে বিএনপির প্ল্যাটফর্মে জামাই আদরে বরিত বা গৃহীত হন। তাদের ভাবখানা তখন গরিব শ্বশুরের (বিএনপি) মহাদামি জামাই। বিএনপি তাদের আপ্যায়ন নিয়ে সারাক্ষণ তটস্থ থাকে। পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়ে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ড. কামাল হোসেন এবং তার সঙ্গীরা জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল নেতা বনে যান। পরিস্থিতি তখন বিএনপির জন্য এতটাই সঙ্গীন হয়ে পড়ে যে, ড. কামাল হোসেন তো দূরের কথা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর তাদের নতুন শ্বশুর বা শাশুড়ির নামটি নিতেও সংকোচবোধ করেছেন। একটি শুকনো হাসি দিয়ে বিএনপি তখন সব মেনে নিয়েছে!
দেশের মিডিয়ায় শোরগোল উঠল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনবিদ দেশের ভেতরে এবং বাইরে ‘ফাটাফাটি’ অবস্থা সৃষ্টি করে ফেলবেন। তার এই ‘ফাটাফাটি’ ডাইলেমা সৃষ্টির জন্যই বোধহয় ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে বিশাল মিছিল সহকারে পাহারা দিয়ে কাঁঠাল রানির জেলখানায় রেখে আসা হয়! তিনি বিশেষ ভাব সহকারে দলবল নিয়ে গণভবনে আলোচনার জন্য গেলেন! কিন্তু সেখানে গিয়ে আলোচনার পরিবর্তে প্রাক্তন আওয়ামী লীগারদের স্মৃতিচারণের প্রীতি সমাবেশে পরিণত হয়! দেখা যায়, ড. কামাল হোসেনই একা নন, বিএনপির পক্ষ থেকে যারা গিয়েছেন, তারাও প্রাক্তন লীগার হিসেবে সেই স্মৃতিচারণায় অংশগ্রহণ করেন! কাজেই যে শক্ত রাজনৈতিক দরকষাকষির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল—তার কিছুই হয়নি।
সেদিনই স্পষ্ট হয়ে পড়ে ২০১৮-এর নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল কী হবে! তবে এ রকম রাত্রিবেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে ছয়-সাতটি আসন ধরিয়ে দেবে—সেটি কস্মিনকালেও ড. কামাল হোসেন কিংবা তার বিএনপিদলীয় ভক্তরা ঘুণাক্ষরেও মালুম করতে পারেননি!
আওয়ামী লীগ শুধু রাজনৈতিক শত্রুদের তুমুলে ধ্বংস করে না—সুযোগ পেলে ড. কামাল হোসেনের মতো অবিশ্বস্ত সঙ্গীদেরও জীবনের তরে বসিয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগের হাতে শত্রু ও মিত্ররা এ রকম বারবার প্রতারিত হলেও একই বেলতলায় যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ হচ্ছেন বিএনপির সেই অতি উৎসাহী গ্রুপটি। তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য (দক্ষিণপন্থার হুমকি কমানোর জন্য) একটা মাইল্ড লীগকে একটু ঠ্যাক দেওয়ার সুযোগ দিতে চান। কিন্তু একটু ঠ্যাক দেওয়ার ফুরসত নিয়ে মাচাসহ যে বন্যার পানিতে পুরো জাতিকে হাবুডুবু খাওয়াবে—সেই হিসাব বোধ হয় কষছেন না। আদি রসের আধিক্য থাকায় শফিক রেহমানের দিনের পর দিন কলামের সেই বিখ্যাত চুটকিটি আর উল্লেখ করলাম না! বিভিন্ন সিম্পটম দেখে তাই মনে হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া বলে গেছেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায় কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না!
আজ পর্যন্ত ছাত্রদলের সব কেন্দ্রীয় সভাপতি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হতে না পারলেও কিংবা সেভাবে মূল্যায়িত হতে না পারলেও প্রায় একহালি প্রাক্তন ছাত্রলীগ সভাপতি জায়গা করে নিয়েছেন। শুধু জায়গা করে নেওয়া নয়। বরং তারা পুরো দলকেই নাক ধরে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো শুরু করেছেন বলে অনুমিত হচ্ছে! এদের মধ্যে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৪ এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। বাকি কয়েকজনও বিএনপিতে বসে লীগের রাজনীতি শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনা কিংবা লীগ আবার ফিরে এলে এদের সবাই বিশেষভাবে পুরস্কৃত হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের বলিষ্ঠ আর্থিক ও নৈতিক চরিত্রের যে ধারণা পোষণ করতাম—সেখানেও হোঁচট খেয়েছি। সত্তরোর্ধ্ব এক সিনিয়র নেতা যিনি আবার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জামায়াতের ৭১-এর ভূমিকাকে কিছুটা স্বস্তিজনক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন—তিনিও (নাতনির বয়সি) নারী-সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে গেছেন! দেখা যাচ্ছে, প্রথম একটা ভিডিওতে ঘটনার আকস্মিকতায় নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাচ্ছেন কিন্তু অন্য একটি ভিডিওতে ওনার প্রথম স্ত্রী স্বামীর ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করে যাচ্ছেন! ভদ্রমহিলা এতে কতটুকু সফল হবেন, তা মালুম হচ্ছে না!
ওপরে বর্ণিত এই ওয়াসওয়াসা জিনরূপী ইবলিশ দেওক কিংবা মানুষরূপী ইবলিশ দেওক—তাকে জব্দ করার জন্য সত্যের আবাবিল পাখির মতো সিটিজেন জার্নালিস্টরা দাঁড়িয়ে গেছেন! এদের একটা অংশ দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে গিয়ে গোলাম মাওলা রনির পেজে হানা দিয়েছেন ।
এ পর্যন্ত তার পেজে এক হাজার মন্তব্যকারী এবং আমার পেজে আটশ মন্তব্যকারীর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ তার এই ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছেন এবং আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। সত্যের এই আবাবিলদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি! আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিজেদের নফসের দুর্বলতায় বিপথগামী হলে এই আপনারাই তাদের সঠিক পথে রাখতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। একটি জ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়তে এই শক্তি সত্যিই আমাদের আশাবাদী করে তুলছে।
লেখক : কলামিস্ট