সিলেটের হাম পরিস্থিতি নিয়ে দিন দিন আরও উদ্বেগ বাড়ছে। বুধবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ বুধবার দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে বোঝা যাচ্ছে, গত পাঁচ মাসেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। থামেনি মৃত্যুর স্রোত। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনও।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকার পরই বর্তমানে সিলেট বিভাগে হামের প্রকোপ ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু মিলিয়ে এই বিভাগে এ পর্যন্ত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে সিলেট অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাই বেশি আক্রান্ত কিংবা মারা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাব পরীক্ষায় হাম ও রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬৮ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২২৭ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৩ জন ভর্তি আছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, আর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৭৬ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগে মারা গেছেন ১০৩ জন, আর পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। দুই ধরনের মৃত্যু মিলিয়ে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। এ জেলায় এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪৭ শিশু। এ ছাড়া মারা যাওয়াদের মধ্যে ৩৬ জনের বাড়ি সিলেটে, মৌলভীবাজারে ১২ জন এবং হবিগঞ্জের ১০ জন। বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আছেন ২৭৩ জন।
সিলেটে হাম ও এর উপসর্গে শত শিশুর মৃত্যুর কারণ কী
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোতে শিশুদের টিকার আওতায় না আনা এবং দেরিতে হাসপাতালে নেওয়াই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার অন্যতম কারণ।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, সিলেট অঞ্চলে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার হার অন্যান্য এলাকার তুলনায় কিছুটা কম। প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি এলাকায় অনেক পরিবার অজ্ঞতার কারণে শিশুদের টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম থাকে। ফলে হামে আক্রান্ত হলে তারা খুব দ্রুত মারাত্মক নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আবার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ জ্বর, সর্দি ও কাশি মনে করে গ্রাম্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া বা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে অনেক সময় রোগ জটিল রূপ ধারণ করে। মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকদের পক্ষে আর শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়া সত্ত্বেও আক্রান্ত শিশুকে আলাদা না রাখা এবং পরিবারের অন্যদের সংস্পর্শে রাখার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের মতো জেলাগুলোর দুর্গম হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং রেফারেল ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। ফলে সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আখলাক আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টিকাহীন শিশু ও অপুষ্টিজনিত কারণে সিলেটে হামে শিশু মৃত্যু হার বেশি। শিশুদের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো এবং পারিবারিক খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছি আমরা। যাতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটে ইপিআই কাভারেজও কম। যারা টিকা দেয়নি কিংবা টিকার প্রাপ্তির ঘাটতির কারণেই মূলত এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই থেকে উত্তরণে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে হবে।
এ ব্যাপারে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক (রোগ তত্ত্ব) ডা. নুরে আলম শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিলেটের প্রত্যন্ত শিশুরাই হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে কিংবা মারা যাচ্ছে। সিলেট বিভাগের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার শিশুরা হামে বেশি মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রচেষ্টার কোনও কমতি নেই।’
সিলেটে হামের জন্য ডেডিকেটেড শহীদ ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) মিজানুর রহমানও স্বীকার করেন ঢাকার পর সিলেটে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি। তার হাসপাতালে ১৩টির পাশাপাশি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২০টি আইসিইউ ওয়ার্ড রোগীতে ভর্তি। সীমাবদ্ধতার মধ্যে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন।