ডেঙ্গু আর শুধু শিশু বা বয়স্কদের জন্য বড় ঝুঁকি নয়; সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে দেশের কর্মক্ষম বয়সী মানুষদের। ডেঙ্গুতে চলতি বছরে ২৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী রোগীদের মৃত্যু হয়েছে সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৩২ জনের মধ্যে ২৬-৪৫ বছর বয়সী ১৬ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫০ শতাংশ। এদের মধ্যে নারী ৯ ও পুরুষ ৭ জন। এ ছাড়া শূন্য থেকে ২৫ বছর বয়সী ৭ জন (২১ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং ৪৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী মারা গেছেন ৯ জন (২৮ দশমিক ১ শতাংশ)।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন মাসের ৩০ দিনে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হলেও জুলাই মাসের মাত্র ১৭ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। অর্থাৎ জুনের পুরো মাসের তুলনায় জুলাইয়ের প্রথম ১৭ দিনেই মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দৈনিক গড় মৃত্যুও বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ।
গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো তথ্যে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৯ জন, চট্টগ্রামে ৩১, ময়মনসিংহে ১৪ এবং বরিশাল বিভাগে ১০ জন। এ সময়ে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগে শনাক্ত হয়নি নতুন কোনো রোগী; মৃত্যু হয়নি কারও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাত মাসের তথ্যমতে, চলতি বছরে মৃত ৩২ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ১৭ জন, ময়মনসিংহে ৫, চট্টগ্রামে ৪, খুলনায় ৩, বরিশালে ২ এবং রাজশাহীতে ১ জন। এ সময়ে সিলেট ও রংপুর বিভাগে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৭৭০ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৩ হাজার ৫১৩ জন, বরিশালে ২ হাজার ৪৪৩, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৭২১ জন, খুলনায় ১ হাজার ২৭৬, ময়মনসিংহে ৩৩৯ জন, রাজশাহীতে ৩২৪, সিলেটে ৮০ এবং রংপুরে ৭৪ জন। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৬০ জনের। সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। অর্থাৎ মৃত্যু কমেছে ২৮ জন বা প্রায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এদিকে মাসভিত্তিক তুলনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের, যা ৪ জন বা প্রায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ কম। গত বছরের জুনে ডেঙ্গুতে ১৯ জন মারা গেলেও চলতি বছরের জুনে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। অর্থাৎ মৃত্যু কমেছে ৬ জন বা প্রায় ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১০ জনের মৃত্যু হলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের, যা ৮০ শতাংশ কম। অন্যদিকে, গত বছরের এপ্রিলে ডেঙ্গুতে ৭ জনের মৃত্যু হলেও চলতি বছরের এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার থাকতে পারে একাধিক কারণ। এ বয়সীদের অনেকে আক্রান্ত থাকেন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে। আবার কেউ কেউ হতে পারেন অন্তঃসত্ত্বাও। এসব শারীরিক অবস্থা ডেঙ্গুর জটিলতা বাড়িয়ে দেয় উল্লেখ করে তার ভাষ্য, এ বয়সীরাই কর্মক্ষেত্র ও জীবিকার প্রয়োজনে সবচেয়ে বাইরে চলাফেরা করেন বেশি। ফলে মশার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও তাদের বেশি থাকে, যা বাড়াতে পারে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি।