সামুন মাহমুদ খান। হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের সামান্য কেরানি। এক সময় মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকা বেতনে তার সংসার চলত। সেই সামুন এখন দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদের মালিক। দানের কোটি কোটি টাকা লুট করে মাজারের জমি দখল করে গড়েছেন আলিশান বাড়ি। এছাড়াও তার রয়েছে দামি ফ্ল্যাট, মার্কেট, হোটেল, এমনকি লন্ডনেও রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি। গভীর রাতে তার ডেরায় বসত বস্তাভর্তি মাজারের টাকা গোনার আসর। বিপুল এই কালোটাকা ও অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে নিজের ছোট ভাই জুন্নুন মাহমুদ খানকে সপরিবারে ১০ বছর ধরে মানসিক প্রতিবন্ধী সাজিয়ে গৃহবন্দি করে রেখেছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণে সামুনের রয়েছে ২০ সদস্যের একটি বিশেষ ক্যাডার বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যের মধ্যে রয়েছে-বাবুল, মনির, সালাউদ্দিন, চেরাগ আলী, নূর ইসলাম, আব্দুর রউফ, দুলু, আলী, ইশরাক কুতুব, মিলন, ফয়েজ, আলী হোসেন, দুলু ও খোকন ওরফে বখরি খোকন প্রমুখ। এর মধ্যে বখরি খোকনও বিপুল সম্পদের মালিক। এই বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যই মাদকাসক্ত। মাজারের ভেতর কেউ কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে এই বাহিনী তাদের ওপর হামলা করত। গত মাসে জেলা প্রশাসন মাজারে নজর দেওয়ার পর থেকে সামুনসহ চক্রের সবাই এখন লাপাত্তা।
সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আমরা মাজারের উন্নয়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান করেছিলাম। চেয়েছিলাম দানের টাকার স্বচ্ছ হিসাব রাখতে। মাজারের বহু জায়গা দখল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেছিলেন, ‘মাজারের এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়ব না। একটা সার্ভে করব, তারপর দেখি কার কতটুকু দখল আছে।’ এরপর তাকেই এখান থেকে সরে যেতে হয়।
সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর কোনো বংশধর নেই। খাদেম নামধারী যেসব লোক এখন মাজারে অপকর্ম করছে তারা কেউই তার বংশধর নয়। সামুন মাহমুদ খান কেরানি হয়েও মাজারের হর্তাকর্তা। মাজারের বেশির ভাগ হরিলুট তার মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিদিন ফজর থেকে ফজর যে টাকা (দান) ওঠে খাদেমরা নিয়ে যান। বছরে কোনো খাদেম ৫ দিন, কেউ ১০ দিন, কেউবা ২০ দিন মাজারের টাকা লুট করেন। আর সামুন একাই বছরে ১৬২ দিন দানের টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে সিলেটের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের শেয়ার ছিল এখানে ২৫ ভাগ। শেয়ার স্থায়ী করতে মাজার এলাকায় খাদেম গোত্র থেকে ফ্ল্যাটও কিনেছিলেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার আলম বলেন, তলোয়ারসহ হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্র আছে। এসব দিয়ে আমরা একটা মিউজিয়াম করতে চাচ্ছিলাম। এ বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশও আছে। কিন্তু মাজারসংশ্লিষ্টদের বাধার কারণে সেটা করা সম্ভব হয়নি। কারণ, ওইসব জিনিসগুলো সামুনসহ বিভিন্ন খাদেমের বাড়িতে আছে। এসব নিয়েও ব্যবসা চলছে।
সামুন মাহমুদ খানের অপরাধ সাম্রাজ্য : মাজারের মোতাওয়াল্লি হিসাবে ফতেহ উল্লাহ আল আমান দায়িত্ব পালন করলেও কয়েক বছর ধরে এখানকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন কেরানি সামুন মাহমুদ খান। মোতাওয়াল্লির দাদার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন তিনি। সেই সুবাদে সেখানে তাকে থাকার জন্য জায়গা দেওয়া হয়েছিল। সেই জায়গায় এখন একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন সামুন। বাড়ির নাম ‘খান কটেজ পায়রা-১’।
স্থানীয়রা জানান, সামুন মাজারের রসিদ বই ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ‘দেওয়ান’র মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন। মাজার ঘিরে সামুনের রয়েছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। প্রতিদিন গভীর রাতে সামুনের ডেরায় বসত দানের টাকা গোনার আসর। ৫ থেকে ৭ জন বিশ্বস্ত লোক নিয়ে তিনি গভীর রাত পর্যন্ত বস্তাভর্তি টাকা গুনতেন। শুধু টাকাই নয়, থাকত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার। মাজারের ভেতরের বাড়ি (খান কটেজ পায়রা-১) ছাড়াও তার রয়েছে মার্কেট, ফ্ল্যাট ও একাধিক বাড়ি। লন্ডনেও রয়েছে তার বিলাসবহুল বাড়ি। এছাড়া সিলেটের একটি নামকরা হোটেলের একটি পুরো ফ্লোরের (তলা) মালিক সামুন। লন্ডনে রেখে পড়িয়েছেন ছেলেমেয়েকে।
সামুনের এই বিত্তবৈভবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ও নির্মম পারিবারিক নির্যাতনের ইতিহাস। সামুনের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন তার ছোট ভাই জুন্নুন মাহমুদ খান ও তার পরিবার। কিন্তু সম্পদের লোভ এবং ক্ষমতার দাপটে সামুন তার আপন ছোট ভাই জুন্নুনকে ১০ বছর ধরে মানসিক প্রতিবন্ধী সাজিয়ে নিজের বাসায় বন্দি করে রেখেছেন। শুধু জুন্নুন খানকেই নয়, তার স্ত্রী ও চার সন্তানকেও (দুই ছেলে ও দুই মেয়ে) বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। জুন্নুন অতীতে বলেছিলেন, তারা সাধারণ মানুষ। ২০-২৫ হাজার টাকা বেতনে তাদের সংসার চলে। কিন্তু তার ভাই সামুন খান অবৈধ উপায়ে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন। মূলত এরপর থেকেই তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ওই বাড়িতে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেও যুগান্তরের পক্ষ থেকে জুন্নুন বা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি।
একটি সূত্র জানিয়েছে, সামুনের পাশাপাশি তার ক্যাডার বাহিনীও অনেকটা আত্মগোপনে রয়েছে। সামুন তার পায়রা-১ নামক আলিশান বাড়িতে সস্ত্রীক অবস্থান করে পুরো দরগা এলাকা সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং করছেন। একান্ত ঘনিষ্ঠ লোকজন ছাড়া কারও সঙ্গে দেখা করছেন না। তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিনি (সামুন) বাসায় নেই। তবে বাসার গ্যারেজেই ছিল তার কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি। সামুনের ভাই জুন্নুনের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী বলেন, তার সঙ্গে দেখা করা নিষেধ আছে।
খোকনও বিপুল সম্পদের মালিক : সামুনের পাশাপাশি রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তার অন্যতম সহযোগী খোকনও। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভক্তরা যেসব ছাগল মানত বা দান করতেন সেগুলো মাজারের ভেতরে খোকনের একটি গোয়ালঘরে রাখা হতো। এরপর কোনো ভক্ত মানতের পশু কিনতে চাইলে তাকে সেই গোয়ালঘরে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখান থেকেই বিক্রি হতো গরু-ছাগল, যেগুলো আগে থেকেই ভক্তরা দান করেছেন। এভাবে একটি গরু বা ছাগল সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া এই অর্থের ভাগ পেতেন সামুনও। টোকের বাজার (গোপালবাজার) এলাকায় খোকনের রয়েছে ৩-৪টি বিলাসবহুল বাড়ি। মাজারের পায়রা এলাকাতেও তার আলিশান বাড়ি ও স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকেও খোকনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা আছে। এছাড়া মাজারের ক্যাশ টাকার জোরে তিনি বিভিন্ন ধরনের লাভজনক ব্যবসাও গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খোকন। তিনি নিজেকে মাজারের খাদেম দাবি করে যুগান্তরকে বলেন, মালিক খাদেমরা তাকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকেন। মাজারে আসা মানতের পশু বারবার কেনাবেচার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, এখানে আমি শুধু চাকরি করি। এসব দেখভালের দায়িত্বে যারা (মালিক খাদেম) আছেন, এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন। তিনি বলেন, মাজারের ভেতর আমার কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। গরু-ছাগলের ব্যবসাসহ যা আছে সব মাজারের বাইরে। গোপাল এলাকার বাড়িটি বাবার টাকায় কেনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পায়রা এলাকার বাড়িতে আমি ভাড়া থাকি।
মোতাওয়াল্লির বক্তব্য : হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান যুগান্তরকে বলেন, সামুন-খোকনদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ আছে। এসব বিষয়ে আগেই তাদের সাবধান করা হয়েছে। তবে উনাদের কড়া নজরদারির কারণেই মাজার থেকে অনেক চোর-চোট্টা বিতাড়িত হয়েছে। তিনি বলেন, নবাবি আমল থেকে মাজারটি একটি সিস্টেমের মধ্যে চলছিল। প্রশাসনের মাধ্যমে এখানে একটি মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মাজারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সিলগালা করার প্রক্রিয়াকে তিনি মাজারের দীর্ঘদিনের স্বাধীন ঐতিহ্যের ওপর এক ধরনের বলপ্রয়োগ বলে উল্লেখ করেন।