বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) মেয়র ছিলেন সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। নগরপিতার দায়িত্ব পালন করেন ২০১৮-২৩ সাল পর্যন্ত। দখলে রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদকের পদ। একই সঙ্গে দলীয় ও সরকারপ্রধানের আত্মীয়তার আশীর্বাদে নগরপিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠেন ‘গডফাদার’।
তার অত্যাচার-নির্যাতন, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে অতিষ্ঠ হন নগরবাসী। এমনকি অস্বস্তিতে ছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে তিনি পালিয়ে যান ভারতে। তবে সেখানেও হয়নি ঠাঁই, তার কুকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র পালাতে বাধ্য করেন অনুসারীরা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যেখানে আশ্রয় পেয়েছিলেন সাদিক, সেখানকার একটি সূত্র জানিয়েছে এসব তথ্য। তার বর্ণনা, সাদিকের অন্যতম বিশ্বস্ত অনুসারী ছিলেন নিরব হোসেন টুটুল। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক হলেও ইলিশ কারবারের সুবাদে শক্ত ঘাঁটি গেড়েছেন পশ্চিমবঙ্গেও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনিই আশ্রয় দিয়েছিলেন তার অন্যতম গুরু সাদিককে।
জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশপরগনার বশিরহাটে ইলিশের কারকার আছে টুটুলের। সে সুবাদে তিনি সেখানেও বেশ প্রভাবশালী। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরার ভোমরায় বিজিবির হাতে আটক হওয়ার পরও ছাড়া পান। এরপর থেকে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছেন পশ্চিমবঙ্গের নিজ বাড়িতে।
‘দিল্লিতে আগে থেকে অবস্থান করছিলেন সাদিকের বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ (শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই)। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও সাদিক অবস্থান নেন বিশ্বস্ত অনুসারী টুটুলের বাসায়। তবে তারও অন্তত ২০ দিন আগে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে একই বাসায় আশ্রয় নেন সাদিকের চার খলিফাখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা বরিশাল মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রইজ আহম্মেদ মান্না, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত, আতিক উল্লাহ মুনিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান। তবে বেশি দিন সাধু সেজে থাকতে পারেননি বিসিসির সাবেক এই মেয়র। দ্রুত তার ওপর ভর করে আগের স্বভাব, জড়িয়ে পড়েন নানা অপকর্মে’— যোগ করল ওই সূত্র।
তার ভাষ্য, একদিন খোদ আশ্রয়দাতার সঙ্গেই বিবাদে জড়ালেন সাদিক। এক রাতে টুটুলের বশিরহাটের বাড়িতে গিয়ে তার শ্যালক ও শ্যালকের স্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণ করে বিষিয়ে তোলেন পরিবেশ। এরপর শুরু হয় তাকে তাড়ানোর চেষ্টা। একপর্যায়ে পুলিশে ধরিয়ে দিতে চাইলে ট্রাভেল পাস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান সাদিক।
পদ হারানোর ভয়ে ভারতে পলাতক এক আওয়ামী লীগ নেতার অভিযোগ, ভারতে পাড়ি জমিয়ে কিছুদিন ঠিক থাকলেও কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় অপকর্ম শুরু করেন সাদিক। বাধ্য হয়ে পালাতে হয় তাকে। তিনি ও তার পরিবারের প্রায় সবাই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে সেখানেই আছেন তিনি।
দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বের হওয়া বরিশাল আওয়ামী লীগের এক নেতা মন্তব্য করলেন, ৫ আগস্ট সাদিকের খামখেয়ালিতে মৃত্যু হয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী তিন নেতার। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে দলের তৃণমূলেও। নিহতদের মধ্যে একজন পাঁচবারের নির্বাচিত সিটি কাউন্সিলর নইমুল হোসেন লিটু। তার লাশ দীর্ঘদিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকলেও দেখার কেউ ছিল না। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও এই বেইমানের কাছ থেকে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগকে গতিশীল করতে তাদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। সাদিক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে হওয়ায় এতদিন তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেননি কেউ।
সাদিকের অপকর্মের জন্য তাকে দেশে এনে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের। বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন আগামীর সময়কে বলছিলেন, সাদিকের নেতৃত্বে বরিশালে বিএনপির নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতার ওপর বর্বর হামলা করা হয়েছে। সেই ব্যক্তি খুব সহজে পালিয়ে দেশ ছেড়ে নিরাপদে চলে গেছেন। প্রশাসনের গাফিলতি ও সহায়তা থেকে এমনটি সম্ভব। আওয়ামী আমলে নগরীকে নরকে পরিণত করেছিলেন তিনি। যেখানেই থাকুক তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
সাদিকসহ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেরাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আশিক সিদ্দিকী। তার ভাষ্য, ‘বরিশালের যারা মামলার আসামি আওয়ামী লীগ নেতা ভারতে পালিয়ে গিয়ে অবস্থান করছেন, তাদের বিষয়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে জানাব। আশা করি, ভালো ফলাফল আনতে পারব।’