Image description

রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গাইবান্ধায় কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদেরও অংশগ্রহণে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দিনভর অচল হয়ে পড়ে জেলা শহর।

১৭ তারিখের আন্দোলনের ঘোষণার পর ১৬ জুলাই রাতেই প্রথম সারির আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের তুলে নিয়েও ১৭ জুলাইয়ের আন্দোলন থামানো যায়নি। বরং ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক পেতে পুলিশের গুলিতে নিহত খবর শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা বাড়িয়েছিল বলে জানান আন্দোলনকারীরা। দিনটি ১৭ জুলাই সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন।

সেদিন বুধবার (১৭ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে শহরের ১ নম্বর রেলগেটে একে একে শহরের-গ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। পরে এতে অভিভাবকরাও অংশ নেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পুরাতন জেলখানা মোড় থেকে পুলিশ সুপারের কার্যালয় পর্যন্ত লাঠি হাতে বিক্ষোভ মিছিল শেষ করে তারা গাইবান্ধা শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ১ নম্বর ট্রাফিক মোড়, ১ ও ২ নম্বর রেলগেট দখলে নেয়। শহরের ১ ও ২ নম্বর রেলগেট দখলে নিয়েই তারা সড়ক ও রেলপথ বন্ধ করেন। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা যাবৎ পুরো শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।

এসময় বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’, ‘আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সেদিন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ

সেদিন দুপুর ১২টার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রেলগেট দখলে নেওয়া আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এসময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ও রেললাইনের পাথর নিক্ষেপ করে। পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সরিয়ে যেতে চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে পুলিশ ১ নম্বর ট্রাফিক মোড় ত্যাগ করে।

আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে ঢিল, পাল্টা হামলা-অগ্নিসংযোগ 

এক নম্বর রেল গেট সংলগ্ন গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। সেদিন একদিকে আন্দোলন চলছিল, অন্যদিকে, ওই জেলা কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক এবং তৎকালীন পৌর মেয়র মতলবুর রহমানসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী কার্যালয়ে মিটিং করছিলেন।

বেলা ১টার দিকে আওয়ামী লীগ কার্যাল থেকে রেলগেটে ও রেললাইনের ওপর অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হলে শিক্ষার্থীরা ক্ষিপ্ত হয় এবং একপর্যায়ে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে অফিস চত্বরে থাকা বিভিন্ন সিসির অন্তত ১১টি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর করে। হামলার সময় বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী অফিসকক্ষে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। পরে আন্দোলনকারীরা দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে আসবাবপত্রও ভাঙচুর করে। এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, সাংগঠনিক সম্পাদক মতলবুর রহমানসহ অন্তত ১২ জন নেতাকর্মী আহত হয় বলে সে সময়ে দাবি করা হয়। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলার পর পুলিশ ক্ষেপে যায় এবং মারমুখি হয়ে দুই নম্বর ট্রাফিক মোড় হয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

আন্দোলনকারী ও পুলিশ-ছাত্রলীগ সংঘর্ষ

পুলিশ আন্দোলনকারীদের দমনে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে সেই সুযোগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শহরে এসে অবস্থান নেয় এবং তাদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশের অন্তত ১০ জন সদস্য আহত ও শিক্ষার্থীদের তারও বেশি আহত হন। পরে পুলিশ ও ছাত্রলীগের একত্রে ধাওয়ার মুখে বিক্ষোভকারীরা রেলস্টেশন ও বিভিন্ন মার্কেট ও স্থাপনায় আশ্রয় নেন।

বিএনপি কার্যালয়ে পাল্টা হামলা

পুলিশ ও ছাত্রলীগের একত্রে ধাওয়ার মুখে আন্দোলনকারীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে এমন পরিস্থিতির মধ্যে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা অফিসের আসবাবপত্র রাস্তায় এনে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরে প্রায় দেড় ঘণ্টা বিলম্বে এসে আগুন নেভায় ফায়ার সার্ভিস।

পুলিশের মামলা

এদিনের এসব ঘটনায় কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সহিংসতায় পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে ১৭ জুলাই রাতেই গাইবান্ধা সদর থানায় মামলা করে পুলিশ। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করা হয়। পরে ওই রাতেই দিনের ফুটেজ দেখে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে গাইবান্ধার প্রায় সবগুলো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া জনপ্রিয় ফ্রি ল্যান্সার রিয়াদ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেদিন রংপুরে আবু সাঈদ ভাইকে গুলি করে নিহত হওয়ার খবর আমাদের আন্দোলনের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। বুক পেতে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই আমরা শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক মোড়ে জড়ো হই। কিন্তু পুলিশ-ছাত্রলীগ আমাদের ধাওয়া করে। আমি দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে হাঁটুতে প্রচণ্ডরকম চোট পাই। ফলে পরদিনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারিনি।

১৭ জুলাইয়ের আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকা গাইবান্ধার থাই ব্যবসায়ীকে জুলফিকার লেলিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আবু সাঈদের মৃত্যুর খবরের পর গাইবান্ধা সরকারি বয়েস স্কুলসহ তিনটি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আমরা মিটিং করি এবং ১৭ জুলাই শহরে একটি মানববন্ধনের ডাক দেই। কিন্তু ওই রাতেই নেতৃত্ব দেওয়া ৩/৪ জনকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় এবং ১৭ তারিখের আন্দোলন হবেনা মর্মে তাদেরকে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করতে বাধ্য করা হয়। সেদিন মানববন্ধন হয়নি, কিন্তু আন্দোলনটি অনেক শক্তিশালী হয়েছিল। আবু  সাঈদের মৃত্যুই আমাদেরকে সোচ্চার করেছিল।

পুলিশের মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা সদর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ওই সময়ে (২০২৪) হওয়া মামলাগুলে তদন্তাধীন রয়েছে।

এদিকে, আজকের ১৭ জুলাইকে সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। দিনটি উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘লীগ ধর’ ম্যারাথন কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গত সোমবার (১৪ জুলাই) দিবাগত রাতে জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ স্মরণে প্রতীকী রাত দখল কর্মসূচির অনুষ্ঠানে দিনটি সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবসে পালনের ঘোষণ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান।