Image description

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। একসময় ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের অন্যতম অগ্রনায়ক। পরে যোগ দেন বিএনপির রাজনীতিতে। রাজনৈতিক জীবনে পেরিয়ে এসেছেন হামলা, মামলা ও কারাবাসের দীর্ঘ পথ। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপন’-এ অতিথি হয়ে তিনি কথা বলেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নানা অভিজ্ঞতা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাহাত রূপান্তর

 

এশিয়া পোস্ট: হাবিব ভাই, আপনাকে স্বাগতম। কেমন আছেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: আপনাকে ধন্যবাদ। এশিয়া পোস্টকেও ধন্যবাদ। দর্শক-শ্রোতা সবাইকে আমার পক্ষ থেকে সালাম এবং শুভেচ্ছা।

 

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে আপনার রাজনৈতিক ব্যস্ততা কেমন কাটছে?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: ব্যস্ততা আসলে আগের মতোই আছে, কমেনি। যাদের সঙ্গে সারাজীবন রাজনীতি করেছি, যারা আমার টানে কাছে আসে বা আমাদের হয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখতে হয়। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমাকে সম্পৃক্ত করতে চায়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা সমস্যা নিয়েও আসে। সব মিলিয়ে আমি এখন একজন সংসদ সদস্যের চেয়েও বেশি ব্যস্ত সময় পার করছি।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর গল্প জানতে চাই। সেই দিনগুলোর গল্প যদি আমাদের বলতেন।

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমার রাজনীতির হাতেখড়ি কিন্তু পাবনা শহর থেকে নয়, বরং আমার নিজ গ্রাম সাহাপুরের সর্দি এলাকা থেকে। সময়টা ১৯৬৫ সাল। আমি তখন সারা বাংলাদেশি উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আকাতুল্লাহ। তিনি আমার মামার বন্ধু ছিলেন। এক দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘হাবিব, চার আনা পয়সা দাও।’ আমি চার আনা পয়সা দেওয়ার পর তিনি একটি রসিদ কেটে দিয়ে বললেন, ‘আজ থেকে তুমি ছাত্রলীগের সদস্য।’ সেই যে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু হলো, এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

 

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তে পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার আব্বা আমাকে কখনোই রাজনীতি করতে নিষেধ করেননি। এরপর আমি এসএসসি পাস করলাম, ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলাম। এরপর মুক্তিযুদ্ধে গেলাম এবং দেশ স্বাধীন করে ফিরে এলাম। মুক্তিযুদ্ধ শেষে অনেকেই অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবার স্পষ্ট কথা ছিল, অন্যায়ভাবে কোনো সম্পদ, এমনকি একটি কলমও যেন আমার বাড়িতে না আসে। নীতি ও আদর্শের সেই শিক্ষা আমি পরিবার থেকেই পেয়েছি।

 

এশিয়া পোস্ট: এত অল্প বয়সে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: তখন তো বয়স অনেক কম, অনুভূতির গভীরতা কতটুকুই বা হবে। তবে সদস্যপদ পাওয়ার পর আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমি গর্ববোধ করতাম যে সংগঠনের একজন সদস্য হতে পেরেছি। সে সময় ছাত্ররাজনীতির একটি আলাদা মর্যাদা ও মূল্য ছিল।

 

এশিয়া পোস্ট: ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন আপনি। সেই আন্দোলনের দিনগুলো এবং আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: ৯০-এর আন্দোলনের সময় সাত দল, আট দল ও পাঁচ দলের সমাবেশ ছিল। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে একটি মঞ্চ করা হয়েছিল। আমি তখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি। মিছিল নিয়ে সেখানে গিয়ে বক্তব্য দিই। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সচিবালয় ঘেরাও করে সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু সভা শেষে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্দেশ দিলেন, মিছিলটি বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ করতে। অনেক নেতা সেখানে যেতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে মিছিল নিয়ে সেখানে গিয়েই কর্মসূচি শেষ করি। সেদিন কোনো বড় নেতা উপস্থিত ছিলেন না। ফলে ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অনেকটা আমার কাঁধেই এসে পড়ে।

 

ফেরার পথে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে দেখি তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল মান্নান ও আরেকজন মোটরসাইকেলে করে দুটি লাশ ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাদের সঙ্গে মেডিকেলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, একটি লাশের হাত কাটা, পরনে প্যান্ট ও লুঙ্গি। সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মধ্যে উপস্থিত একজন বললেন, ৩২ নম্বর থেকে নির্দেশনা চাওয়া হচ্ছে।

 

আমি তখন ভাবলাম, এই লাশগুলো নিয়ে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যায়, তাহলে একটি প্রকৃত গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এরপর ট্রলিতে করে লাশগুলো নিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা হই। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তখন এক অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছিল। কারও কোনো স্লোগানের প্রয়োজন হয়নি। সবাই লাশের প্রতি সম্মান জানিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

 

ঠিক সেই সময় খবর পেলাম, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হলের সামনে এসেছেন। আমি সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। ম্যাডাম গাড়ি থামিয়ে আমাকে বললেন, ‘হাবিব, তোমরা আন্দোলন চালিয়ে যাও, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।’ তার এই আশ্বাস আমাদের নতুন শক্তি জুগিয়েছিল। এরপর আমরা লাশ নিয়ে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রাখি।

 

 

এশিয়া পোস্ট: আপনি তখন ছাত্রলীগের সভাপতি, খালেদা জিয়া বিএনপির প্রধান। সেই প্রেক্ষাপটে তার ওই আহ্বানকে আপনি কীভাবে দেখেছিলেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: এটি ছিল মূলত আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে। স্বৈরাচার পতনের যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছিলাম, সেই ঐক্যের খাতিরেই তিনি আমাকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। এরপর আমরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করলাম। সেখানে আমি বক্তব্যে বলেছিলাম, ‘তোমাদের নাম জানি না, পরিচয় জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, তোমরা এরশাদকে উৎখাত করতে এসেছিলে। তোমাদের লাশের শপথ নিয়ে বলছি, এরশাদকে উৎখাত না করে আমরা ঘরে ফিরব না।’

 

পরে ভিসি বারবার লাশ হস্তান্তরের জন্য ডাকছিলেন। আমি স্পষ্ট বলেছিলাম, শেখ হাসিনা নিজে ক্যাম্পাসে এসে লাশ না দেখা পর্যন্ত আমরা দেব না। অবশেষে তিনিসহ আট দল ও পাঁচ দলের নেতারা এলেন এবং শপথ পাঠ করালেন। সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া নিয়ে কিছুটা বিশৃঙ্খলা হলে আমিই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলাম।

 

পরবর্তীতে লাশের পকেটে একটি চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল, নাজির উদ্দিন জেহাদ, উল্লাপাড়া কলেজের ছাত্রদল নেতা। অর্থাৎ শহীদ ছিলেন ছাত্রদলের। এরপর আমরা ডাকসু অফিসে বসে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের রূপরেখা তৈরি করি। আমিই ‘সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য’ নামটি প্রস্তাব করেছিলাম। জেহাদের লাশ নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই সেই ঐতিহাসিক ঐক্যের সূচনা হয়েছিল।

 

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের রাজনীতি করার পর ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। কী কারণে এমন বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: এর পেছনে কিছু যৌক্তিক ও নীতিগত কারণ ছিল। ৯০-এর আন্দোলনের সময় থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঙ্গে আমার এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ তখন মনে করেছিল, বিএনপি ক্ষমতা থেকে চলে গেছে। জাতীয় পার্টির এরশাদ টিকে থাকলে বিএনপির নেতারা আরও বেশি করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবেন এবং একসময় বিএনপি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল, বিএনপি পুরোপুরি খালি হয়ে গেলে তিনি এরশাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলন করবেন। ৯০-এর আন্দোলনে আমি যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, তা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সম্ভবত ইতিবাচকভাবে নেয়নি।

 

পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ক্যাম্পাসে কোনো সংঘর্ষ বা কেউ আক্রান্ত হলে তার দায়ভার বারবার আমার ওপর চাপানো হতো। আমাকে প্রশ্ন করা হতো, আমি কেন ওই আন্দোলন করেছিলাম। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হলেও মনোনয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছিল। আমাকে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করিয়ে নির্বাচনে দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল একটি বড় ষড়যন্ত্র। পরাজয়ের পর বলতে শুরু করা হলো, আমি নাকি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার লোক।

 

অথচ ম্যাডাম আমার আন্দোলনের ভূমিকার কারণে আমাকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। তিনি আমার এলাকায় আমার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বক্তব্য দেননি, বরং প্রশংসা করেছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার অধিকার ও সম্মানের প্রশ্ন সামনে এলে আমি প্রকাশ্যেই দল ত্যাগ করি। আমি মনে করেছিলাম, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার জন্য আমার জন্ম হয়নি।

 

এশিয়া পোস্ট: বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর আপনার রাজনৈতিক পথচলা কেমন ছিল? বিশেষ করে ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: বিএনপিতে আসার পর ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৯৬ সালের পর থেকেই আমি দলের জন্য কাজ শুরু করি।

 

২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করি এবং বিএনপির প্রার্থীর চেয়েও বেশি ভোট পাই। জামায়াত তখন আমাকে খুব ঘৃণা করত। তারা পরিকল্পিতভাবে আমার বিরোধিতা করেছিল।

 

২০০৮ সালের নির্বাচনেও প্রায় একই ঘটনা ঘটে। আমার নাম চূড়ান্ত হওয়ার পরও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন কেটে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীকে দেওয়া হয়। নিজামী সাহেব ছাড়া জামায়াতের প্রায় সব নেতা ম্যাডামের সঙ্গে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা দর-কষাকষি করে আমার মনোনয়ন বাতিল করিয়েছিলেন।

 

ম্যাডাম ও তারেক রহমান চেয়েছিলেন আমি যেন নির্বাচন করি। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে ম্যাডামকে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এমনকি তিনি আমাকে অন্য একটি আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি রাজি হইনি। জোটের স্বার্থে সেদিন আমি অনেকটা রাজনৈতিকভাবে ‘জবাই’ হয়েছিলাম। তারপরও দলের নির্দেশ অমান্য করিনি। দলের স্বার্থেই কাজ করে গেছি।

 

এশিয়া পোস্ট: গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে এমন কোনো অভিজ্ঞতা বা ঘটনা আছে, যা এখনও আপনাকে নাড়া দেয়?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: সেই সময়টা ছিল চরম আতঙ্কের। সবসময় মামলার ভয়ের মধ্যে থাকতে হতো। তবে আমি রাজপথ ছাড়িনি, টকশোতেও সক্রিয় ছিলাম।

 

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন আমাকে দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নানা শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি স্পষ্ট বলেছিলাম, যারা বিএনপি করবে তারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই করবে, আর যারা আওয়ামী লীগ করবে তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই করবে। কোনো সরকার বা শক্তির ক্ষমতা নেই এই দুই নেত্রীকে মাইনাস করার।

 

২০১৫ সালে একবার টকশো থেকে নামার পরই ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় আমাকে শাস্তি দিতেই হবে, সরকারের অবস্থান ছিল এমনই। বড় বড় নেতারা ফোন করে বলতেন, মুখ বন্ধ করলে কোনো শাস্তি হবে না। কিন্তু আমি নতি স্বীকার করিনি।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনি একসময় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ। আপনার সময়ের ছাত্রলীগ আর বর্তমানের ছাত্রলীগের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: এখন তো ছাত্রলীগের অস্তিত্বই নেই। গত সাড়ে ১৭ বছরে ছাত্রলীগ যা করেছে, তা কল্পনা করাও কঠিন। আমাদের সময় ছাত্রলীগ ছিল ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি’র পতাকাবাহী একটি আদর্শিক সংগঠন। আমরা জেল-জুলুম সহ্য করে রাজপথে সংগ্রাম করেছি।

 

বর্তমানের ছাত্রলীগ জড়িয়েছিল লুটপাট, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও খুনখারাবিতে। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তাতে সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি ছিল। আমি ছাত্রলীগকে ভালোবাসি তার ইতিহাসের কারণে। কিন্তু তারা যে দানবীয় রূপ ধারণ করেছিল, তা নিষিদ্ধ হওয়ায় আমি বরং খুশি হয়েছি। এই ছাত্রলীগের কোনো সংস্কারেই কাজ হবে না। কারণ, তারা পুরোপুরি নীতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল।

 

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের সময় যে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: জুলাই আন্দোলনে যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ছোট ছোট শিশুদের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে মারা হয়েছে। ঘরে বসে থাকাও নিরাপদ ছিল না। অনেক শিশু শহীদ হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা অন্ধ হয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ করেছে।

 

এই অন্যায়ের জন্য আওয়ামী লীগ বা সরকার হাজারবার মাফ চাইলেও জনগণ তাদের ক্ষমা করবে কি না, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যেভাবে রক্ত ঝরানো হয়েছে, তা জাতি কোনোদিন ভুলবে না।

এশিয়া পোস্ট: পাবনা-৪ আসনে সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে কী কী কারণ দেখেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমি আসলে পরাজিত হইনি, আমাকে ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছে। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ কারসাজিতে ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে আমাকে পরাজিত দেখানো হয়েছে। ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন।

এ ছাড়া দলের ভেতরেও কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি সাক্ষ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দিলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে আমি দমে যাওয়ার মানুষ নই। মানুষের পাশে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।

 

এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: কিছু পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে। আগে যেভাবে ভয়ভীতির পরিবেশ ছিল, এখন মানুষ অন্তত প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছে। গুম-খুনের আতঙ্ক আগের মতো নেই। টকশোতে কথা বলার জন্য কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুরোপুরি ঠিক হতে আরও সময় লাগবে। জবরদখল ও দুর্নীতির যে বীজ বপন করা হয়েছে, তা উপড়ে ফেলা আমাদের সবার দায়িত্ব।

 

এশিয়া পোস্ট: বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফায় সংবিধান সংস্কারের কথা থাকলেও বর্তমানে এ নিয়ে ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। দলের অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: বিএনপি জনস্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার, যাই বলি না কেন, তা হতে হবে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর আমরা বাস্তবায়ন করব। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারবে।

 

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনো ব্যর্থতা, আক্ষেপ বা ভুল সিদ্ধান্ত কি আজও আপনাকে ভাবায়?

 

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বিএনপিতে যোগ দেওয়া আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত। আজ যদি আমি আওয়ামী লীগে থাকতাম, তাহলে হয়তো আমাকেও দেশ ছেড়ে পালাতে হতো, কিংবা জনশত্রুতে পরিণত হতে হতো।

 

আমি মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বেঁচে আছি। আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হলো ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সাহচর্য। জেলে যাওয়ার আগে তার কাছে নির্দেশ চাইলে তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘এলাকার মানুষের পাশে থেকো। সাধারণ মানুষ যেন কষ্ট না পায়।’ এমন একজন মমতাময়ী নেত্রীর জন্য কাজ করতে পারা আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমৃত্যু থাকবে।