অফিসের বসকে একটা তথ্য জানাতে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করলাম। তিনি কিছু না বলে একটা ‘থাম্বস আপ’ বা লাইক ইমোজি পাঠালেন। ধরে নিলাম, তিনি কাজটি অনুমোদন করেছেন বা সম্মতি জানিয়েছেন। অথচ কিছুদিন আগে এই ‘লাইক’ পাঠানো নিয়েই একচোট ঝগড়া হয়ে গেল বরের সঙ্গে।
কারণ কিছু না বলে শুধু ‘লাইক’ পাঠানো মানে কোথাও সমস্যা আছে। হয়তো কোনো কারণে চটে আছেন বা এই বিষয়ে কথা বলতে চান না। ইমোজির মানে বদলে যাওয়ার এই ঝামেলায় কি আপনিও পড়েছেন?
ডিজিটাল যুগে ইমোজি এখন আমাদের প্রতিদিনের যোগাযোগের অংশ। তবে কোন ইমোজির কী অর্থ তা না জানলে কিংবা কাকে কোন ইমোজি দেওয়া যাবে, তার ধারণা না থাকলে ইমোজি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।
ইমোজি কি আমাদের নতুন বর্ণমালা
পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাভাষী মানুষই ইমোজি ব্যবহার করেন। তাই অনেকেই একে ইন্টারনেটের ‘সার্বজনীন ভাষা’ বলেন।
ইমোজি আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় জাপানি প্রকৌশলী শিগেতাকা কুরিতাকে। ১৯৯৯ সালে তিনি মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য ১৭৬টি ছোট ইমোজি তৈরি করেন। এরপর ধীরে ধীরে জাপানজুড়ে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।
পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাভাষী মানুষই ইমোজি ব্যবহার করেন। সংগৃহীত ছবি
তবে ইমোজির জন্ম নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, ইমোজি একদিনে তৈরি হয়নি। প্রযুক্তির সঙ্গে সংস্কৃতির মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে আজকের ইমোজির। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ, চীনা অক্ষর কিংবা জাপানের মাঙ্গা সংস্কৃতির সঙ্গে এর কিছু মিলও খুঁজে পাওয়া যায়।
২০১১ সালে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম ইমোজির মান নির্ধারণের দায়িত্ব নেয়। এরপর অ্যাপল তাদের আইফোনে ইমোজি কিবোর্ড যুক্ত করে। তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরে গুগলসহ অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ইমোজি যুক্ত করে।
২০১৩ সালে চালু হয় ইমোজিপিডিয়া। এই ওয়েবসাইট সব ইমোজির তথ্য সংরক্ষণ করে। একই বছর অক্সফোর্ড ডিকশনারিও ‘ইমোজি’ শব্দটি অভিধানে যুক্ত করে। ২০১৫ সালে ‘হাসতে হাসতে চোখে পানি আসা ইমোজি’ বা ফেস উইথ টিয়ার্স অফ জয় ‘বর্ষসেরা শব্দ’ নির্বাচিত হয়। এটি ‘শব্দ’ হিসেবে ইমোজির জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি।
লেখক কিথ হিউস্টন ‘ফেস উইথ টিয়ার্স অব জয়: আ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইমোজি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ইমোজি পুরোপুরি ভাষা নয়। আবার ভাষার বাইরেও নয়।’ তাঁর মতে, এগুলো ভাষার গভীরে থাকা বিদ্রোহ। অঙ্গভঙ্গি বা মৌখিক অভিব্যক্তির মতোই এগুলো আমাদের অনুভূতি প্রকাশ করে। তাই ইমোজিকে অনেকেই নতুন যুগের বর্ণমালা বললেও, ভাষাবিদদের মধ্যে এ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
আমরা কি এখন ইমোজির মাধ্যমে ভাবতে শিখেছি
ডিজিটাল যুগে ইমোজি ব্যবহার আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। অনেক সময় মনের ভাব প্রকাশ করতে পুরো বাক্যের বদলে একটি ইমোজিই যথেষ্ট হয়। আনন্দ, দুঃখ, রাগ কিংবা বিস্ময়—সবকিছুই কয়েক সেকেন্ডে প্রকাশ করা যায়।
কিন্তু সবাই একইভাবে ইমোজি ব্যবহার করেন না। গত বছর ‘দ্য প্রিন্ট’-এ প্রকাশিত প্রবন্ধ বলছে, বয়সভেদে ইমোজির ব্যবহার ও অর্থ বোঝার ধরনে পার্থক্য রয়েছে। চীনা ভাষাভাষী উইচ্যাট ব্যবহারকারীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, তরুণ ও বয়স্কদের পছন্দ এবং ব্যাখ্যা এক নয়।
যেমন ‘ফেস উইথ টিয়ার্স অফ জয়’ ইমোজি। একসময় এটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় ইমোজি। কিন্তু ২০২০ সালের পর জেনারেশন জেডের অনেক ব্যবহারকারী এটিকে ‘আনকুল’ বা পুরোনো ধাঁচের বলে মনে করতে শুরু করেন। ফলে তাদের মধ্যে এর ব্যবহার কমে গেছে।
একই ইমোজির অর্থ আবার প্ল্যাটফর্মভেদেও বদলে যায়। প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজস্ব যোগাযোগের ধরন তৈরি হয়। গবেষকেরা একে বলেন ‘প্ল্যাটফর্ম ভার্নাকুলার’। তাই সব প্ল্যাটফর্মে একই ইমোজির অর্থ এক নাও হতে পারে। থাম্বস আপ বা লাইক ইমোজিরও একই অবস্থা। অনেক ব্যবহারকারীর কাছে এটি কখনো কখনো কথোপকথন শেষ করার ইঙ্গিত হিসেবেও ধরা পড়ে।
আমরা এখনো যোগাযোগে ইমোজির প্রভাব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। সংগৃহীত ছবি
ইউগভ এবং অ্যাটলাসিয়ানের করা যৌথ এক জরিপে দেখা যায়, পাঁচটি দেশের ৬৫ শতাংশ কর্মী অফিসে ইমোজি ব্যবহার করেন। তবে জেনারেশন জেডের ৮৮ শতাংশ কর্মী মনে করেন, ইমোজি যোগাযোগ সহজ করে। বেবি বুমার ও জেন এক্স প্রজন্মের মাত্র ৪৯ শতাংশ এই মতের সঙ্গে একমত।
ইমোজিতে কি আমাদের সত্যিকারের অনুভূতি ঢেকে যায়
যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইমোজির সবচেয়ে বড় শক্তিই আবার এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কারণ, অনেক ইমোজির নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। একই চিহ্ন ভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। কিছুদিন আগে দেখলাম, দুই হাত জড়ো করা যে ইমোজিটি এতদিন ‘ধন্যবাদ’ বলতে বা ‘ক্ষমা চাইতে’ ব্যবহার করেছি, এটি দিয়ে নাকি ‘হাই ফাইভ’ বোঝায়। দেখে তো আমার আক্কেল গুড়ুম! কমেন্ট সেকশনে গিয়ে দেখি, আমার মতো অনেকেরই একই অবস্থা।
‘এক হাত উঁচিয়ে রাখা বালিকা’ ইমোজির গল্পও একই রকম। অ্যাপল প্রথমে এটিকে ‘ইনফরমেশন ডেস্ক অ্যাটেনডেন্ট’ নামে প্রকাশ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সাহায্যের ভঙ্গি দেখানো। আমিও এটি ‘মনোযোগ আকর্ষণের’ বা ‘হাত তোলার’ ইমোজি হিসেবে ব্যবহার করতাম অনলাইন ক্লাসে।
কিন্তু অনেক ব্যবহারকারী এটিকে চুল ঝাঁকানোর ভঙ্গি হিসেবে দেখেছেন। ফলে এটি পরে ব্যঙ্গ বা খোঁচা দেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।
একটি ইমোজি কখনো আন্তরিকতা বোঝায়। কখনো বিদ্রূপ বোঝায়। আবার কখনো ব্যঙ্গ প্রকাশ করে। এর অর্থ নির্ভর করে ব্যবহারকারী, প্রেক্ষাপট এবং প্ল্যাটফর্মের ওপর। তাই ইমোজি সব সময় অনুভূতি স্পষ্ট করে না।
লেখক কিথ হিউস্টন তাই ইমোজিকে একটি ‘রঙিন ভাইরাস’ বলেছেন। তাঁর মতে, আমরা এখনো যোগাযোগে ইমোজির প্রভাব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
যদি ইমোজি না থাকে…
আমি ২০১৫ সালে ফেসবুক ব্যবহার শুরু করি। হাসি পেলে ‘হা হা হা’ বানান করে লেখা কিংবা দুঃখ পেলে শব্দের মাধ্যমেই তা বোঝাতাম। তবে ইমোজি-র সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর যোগাযোগের ধরনে বদল এসেছে। শুধু মেসেজ আদান-প্রদান নয়, কমেন্টেও ইমোজির ব্যবহার মনের ভাব প্রকাশে পরিবর্তন নিয়ে আসে।
তাই কখনও যদি ইমোজি ‘আনকুল’ হয়ে যায়, তখন এটি ছাড়া কীভাবে মেসেজিং করবো তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তবে ইমোজি না থাকলে আমরা হয়তো আবারও মনের ভাব প্রকাশ করতে সঠিক শব্দ ব্যবহার করে কথা বলতে শিখব। এখানে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না। ভুল বোঝাবুঝিও কিছুটা কমবে। বিশেষ করে, যারা এখনও ঠিকমতো ইমোজি ব্যবহার করতে জানে না, তাদের খুব সুবিধা হবে। ভুলভাল ইমোজি ভুল জায়গায় ব্যবহার করে আর বিপদে পড়ার আশংকা থাকবে না।