চব্বিশের ২১ জুলাই। চারদিকে তখন বারুদের গন্ধ, উত্তাল মিরপুর। স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার যে মিছিল নেমেছিল রাজপথে, তাতে শামিল হয়েছিল মিরপুরের রূপনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মারুফ আহমেদ। সেই আন্দোলনের পর কেউ আহত শরীরে, কেউবা শহীদি মর্যাদায় নিহত হলেও, আজও ফেরেনি মারুফ।
আন্দোলনের দুই বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু একমাত্র কিশোর সন্তান মারুফের অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে এখন দিশেহারা মা মৌসুমী আক্তার।
গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মিরপুরের দুয়ারিপাড়ার ৫ নম্বর মসজিদ সড়কের মারুফদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় এক বেদনাবিধুর দৃশ্য। ছোট একটি ঘরের এক কোণে সাজানো রয়েছে মারুফের পড়ার টেবিল, বই-খাতা। পাশেই রাখা খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া কয়েকটি পুরস্কার। আর আলমারিতে যত্নে তুলে রাখা ঈদের নতুন পাঞ্জাবি। ছেলে ফিরলে তাকে পরিয়ে দেবেন, এই আশায় বুক বেঁধে আছেন মা।
আন্দোলনের সময়ের বর্ণনা দিয়ে মারুফের মা মৌসুমী আক্তার বলেন, ‘২১ জুলাই সকালে মারুফ বলল—“মা, ৬০টা টাকা দাও।” টাকাটা নিয়ে ওই যে বের হলো, আর ফিরে এলো না সে। বহু জায়গায় খুঁজেছি, কেউ আমার ছেলের খোঁজ দিতে পারল না।’

শেষ কথা হয় বিকেল ৩টায়
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই মিরপুর এলাকায় নিয়মিত অংশ নিত মারুফ। ২১ জুলাই সকাল ১০টার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়। এরপর দফায় দফায় মায়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় তার। সর্বশেষ কথা হয়েছিল ওই দিনই বিকেল ৩টার দিকে। এরপর থেকেই মারুফের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, যা আর কখনো খোলেনি।
পরে মারুফের ফোনটি অন্য এক যুবকের কাছে পাওয়া গেলে পুলিশ তাকে সিলেট থেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই যুবক জানান, তিনি উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় ফোনটি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।
মারুফ গুমের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। তারা জানান, নিখোঁজের পর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ও রায়েরবাজার কবরস্থানসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় সন্তানকে খুঁজে ফিরেছেন মৌসুমী আক্তার। কিন্তু কোথাও ছেলের কোনো হদিস পাননি তিনি।

ছেলের সন্ধানে দিশেহারা মা
ইসমাঈল হাসান ও মৌসুমী আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান মারুফ। মারুফের জন্মের মাত্র তিন মাসের মাথায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বাবা ইসমাঈল। এরপর একমাত্র সন্তানকে বুকে নিয়ে সিলেট থেকে ঢাকায় চলে আসেন মৌসুমী আক্তার। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমে ছেলেকে বড় করছিলেন। মিরপুরের একটি ছোট্ট টং দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে চলে তার জীবনসংগ্রাম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মৌসুমী আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়েছি আগেই। একমাত্র ছেলে, সেও জীবিত না মৃত কিছুই জানি না। আমার আর আপন বলতে কেউ নেই, বেঁচে থাকার অর্থও খুঁজে পাচ্ছি না।’

মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ক্ষোভ জনপ্রতিনিধির ওপর
নিখোঁজ হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মারুফ রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি পায়নি বলে অভিযোগ মায়ের। তিনি জানান, ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক ব্যক্তিগতভাবে তাকে এককালীন কিছু টাকা এবং আট মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় (ঢাকা-১৬) সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন একবারের জন্যও এই অসহায় মায়ের খোঁজ নেননি।
মৌসুমী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলে জুলাই আন্দোলনে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। সে এ দেশের নাগরিক। স্থানীয় এমপির উচিত ছিল আমার খোঁজ নেওয়া। কিন্তু আমি কী পরিস্থিতিতে আছি, তা জানতে তিনি একবারও আসেননি।’
সন্তানকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করে মারুফের মা বলেন, ‘আমি প্রভাবশালী নই, আমার কোনো মন্ত্রী-এমপি আত্মীয় নেই। সরকারের কাছে দাবি, আমার সন্তানকে খুঁজে বের করা হোক। আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে আমার সন্তানের খোঁজ চাই।’