Image description

কর্মক্ষমতার শীর্ষ সময়ে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা। জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর লাখো মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে উৎপাদনশীল বয়সেই। প্রবাসের কঠিন কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানা প্রতিকূলতায় টিকতে পারছেন না তারা। ফলে প্রবাসীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জোরাল হয়ে উঠছে।

পরিবারে আর্থিক স্বস্তি ফেরাতে ২৭ বছর বয়সে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন বরিশালের সাইফুল ইসলাম। কিছুদিন পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

সাইফুলের মতোই পরিবারের স্বপ্ন পূরণ ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে বিদেশে পাড়ি জমান লাখো বাংলাদেশি তরুণ। কিন্তু প্রবাসেই জীবন থেমে যাচ্ছে অনেকের। তেমনি একজন মো. মিলন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাজের উদ্দেশ্যে কুয়েতে গিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সে। তিনবছর পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সেখানেই মারা যান।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষমতা থাকে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সে। অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মারা যাওয়া প্রবাসীদের গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর। অর্থাৎ অধিকাংশই ছিলেন কর্মক্ষম।

গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, বিদেশে কর্মরত সুস্থ-সবল তরুণ শ্রমিকরা কেন এত অল্প বয়সে মারা যাচ্ছেন এবং কেন অধিকাংশ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনীম সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রবাসী কর্মীদের প্রায় ২৭ শতাংশ মৃত্যুই অস্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন বা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অভিযোগ থাকলেও মৃত্যুসনদে শুধু ‘হার্ট ফেইলিউর’ উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় মরদেহ দেশে আসার পর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলে পুনরায় ময়নাতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা উচিত।

এদিকে, কয়েক মিনিট কিংবা ঘণ্টায় প্রবাসে মৃত শ্রমিকের তথ্য পাওয়া গেলেও তার লাশ ফিরিয়ে আনতে লড়াইয়ে নামতে হয় পরিবারগুলোকে। এক্ষেত্রে সাইফুল-মিলনসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর গল্প প্রায় একই। কুয়েতে মৃত মিলনের মরদেহ ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কুয়েতে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী এবং স্বজনদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ৪৩ দিন পর দেশে ফেরে মিলনের মরদেহ। একই ধরনের ভোগান্তির শিকার বরগুনার রনি মীরের পরিবারও। গত ২৪ এপ্রিল কুয়েতে মারা যাওয়ার পর তার মরদেহ দেশে ফিরতে লাগে এক মাসেরও বেশি সময়।

এ বিষয়ে তাসনীম সিদ্দিকী বললেন, বিদেশ থেকে মরদেহ আনার জন্য আর্থিক সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈধ বা অবৈধ—যে পথেই বিদেশে যাক না কেন, যদি কোনো প্রবাসী দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন, তবে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই নেওয়া উচিত।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বোর্ডের সহায়তায় দেশে আনা হয়েছে ৪ হাজার ৪৩৮ প্রবাসীর মরদেহ। এ জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছে ৩৪ প্রবাসীর মরদেহ। ৩৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাদের পরিবারকে।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সহায়তায় দেশে ফেরত আসা মরদেহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২৫ সালে। ওই বছর ১ হাজার ২৭৮ জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তাদের পরিবারকে দেওয়া হয় ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে ফিরেছে ৪৯৯ জনের মরদেহ।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৮১৩ প্রবাসীর মরদেহ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২ জন। ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪ এবং ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট মরদেহ ফিরেছে ৫৬ হাজারের বেশি প্রবাসীর।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ কর্মী। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ১০ হাজার ৩৪ জনে। ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪৫৩ জন বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান পান। ২০২৪ সালে সংখ্যা কিছুটা কমে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জনে নামলেও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ৬২ হাজার ৩৫২ জন নারী।

বিএমইটির তথ্যে জানা যায়, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩ হাজার ৭৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৮৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৩ সালে ২১ হাজার ৯৪২ মার্কিন মিলিয়ন ডলার এবং ২০২২ সালে ২১ হাজার ২৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চলতি বছরের জুনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে প্রবাসীদের নানাবিধ সমস্যা নিরসন ও তাদের অধিকার রক্ষায় একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রবাসী কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধা মারা গেলে তার মরদেহ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার পাশাপাশি তাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিতে হবে।’