Image description

রাজধানীর শান্তিনগর থেকে বেইলি রোড ধরে মহিলা সমিতির দিকে এগোলে একসময় চোখে পড়ত একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান— সাগর পাবলিশার্স। এটি শুধু একটি বইয়ের দোকান নয়; ছিল ঢাকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনকেন্দ্র। প্রতিদিন সেখানে বসত সাহিত্য আড্ডা। কবি আসাদ চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ— অনেকেই ছিলেন এই আড্ডার নিয়মিত মুখ।

নব্বইয়ের দশকে সাগর পাবলিশার্সে নিয়মিত যাতায়াত করতেন নাট্যশিল্পী কেরামত মওলা। স্মৃতিচারণ করে আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিন সাগর পাবলিশার্সে না গেলে যেন পেটের ভাতই হজম হতো না। ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের এমন কেউ ছিলেন না, যিনি এখানে আসেননি। বসার জায়গা না পেয়ে অনেককে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, তবু আড্ডার আনন্দ কমত না।’

সাগর পাবলিশার্স ছিল লেখক, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রাণের জায়গা। নাটক ও টেলিভিশন প্রযোজনার শুটিং লোকেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে এটি। এমনকি আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘বেইলি রোড’-এও উঠে এসেছে সাগর পাবলিশার্সের নাম। গানের কথায় ধরা পড়েছিল সেই সময়ের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ। ‘সাগর পাবলিশার্সে কে বেশি ঢোকে/ কেউ কেউ অকারণে ঘোরাঘুরি করে/ মনে হয় সর্বদা উৎসব চলে/ শান্তিনিকেতনী ব্যাগ কারও কাঁধে/ আর্ট-কালচার সব যেন এইখানে/ নাটক দলের সব কর্মীর ভিড়ে/ আসলে ওরা সবাই ব্রড মাইন্ডেড’।

কিন্তু আজ সেই বেইলি রোড যেন শুধুই স্মৃতি। প্রায় এক বছর আগে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে সাগর পাবলিশার্স। বইয়ের দোকানের জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে একটি মিষ্টি ও বেকারির দোকান। সাগর পাবলিশার্সের পাশের একটি বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন কেরামত মওলা। তার ভাষায়, ‘স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাট্যচর্চার বড় অংশই বেইলি রোডকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। নাট্যকর্মী, কবি, সাহিত্যিক— সবাই এখানে আসতেন। এই আড্ডা আমাদের এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, অনেকে বেইলি রোডের আশপাশে বসবাসের জন্য ফ্ল্যাটও কিনেছিলেন।’

বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার স্টুয়ার্ট বেইলির নামানুসারে এই সড়কের নামকরণ। ১৯৭৩ সালে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হাত ধরে বাংলাদেশে টিকিট কেটে নাটক দেখার সংস্কৃতির সূচনা হয়। নাট্যদলগুলোর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এই সড়কের নাম ২০০৫ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আনুষ্ঠানিকভাবে রাখেন ‘নাটক সরণি’।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। মহিলা সমিতির মঞ্চে এখনো মাঝেমধ্যে নাটক মঞ্চস্থ হয়, তবে নেই আগের সেই প্রাণবন্ত আড্ডা। নাটক শেষ হওয়ার পর শিল্পী-দর্শকদের দীর্ঘ আলাপচারিতা এখন আর দেখা যায় না। বর্তমানে মহিলা সমিতি ভবনের নিচতলায় বসে ভ্রাম্যমাণ মেলা; গয়না, পোশাকসহ নানা পণ্যের পসরা সেখানে। মহিলা সমিতির ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা গাজী ফিরোজ বলেছেন, ‘এখন যে নাট্যদলের শো থাকে, তারা আসে, দর্শকরাও নাটক দেখতে আসেন। কিন্তু আগের মতো আড্ডা আর হয় না। সবাই এখন ব্যস্ত।’

দীর্ঘদিন ধরে মহিলা সমিতি ভবনেই পরিচালিত হয়েছে দেশের প্রথম বেসরকারি নাট্যশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থিয়েটার স্কুল। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। পরে প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল-মামুনের নামে এর নামকরণ করা হয়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিও বেইলি রোড ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পাশে থিয়েটার কর্নার নামের বইয়ের দোকানটিও একসময় ছিল নাট্যকর্মীদের মিলনস্থল।

দোকানটির উদ্যোক্তা নাট্যশিল্পী চন্দন রেজা জানিয়েছেন, এখন আর সেখানে আগের মতো আড্ডা জমে না। একসময় মহিলা সমিতির পাশাপাশি গাইড হাউজ মিলনায়তনেও নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ হতো। সেই আয়োজনও এখন বন্ধ।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের মতে, আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিনোদনের জায়গাগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এখন খাবারই যেন নগরবাসীর প্রধান বিনোদন। চারদিকে শুধু রেস্তোরাঁ আর খাবারের দোকান। বেইলি রোড ঘুরে সেই বাস্তবতাই চোখে পড়ে। মহিলা সমিতি ভবনের ছাদেও গড়ে উঠেছে রুফটপ রেস্তোরাঁ।

কেরামত মওলার আক্ষেপ আরও গভীর। তিনি বলেছেন, ‘বেইলি রোডে ভিকারুননিসা স্কুল, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের সামনে এখন আর কোনো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিবেশ নেই। আছে শুধু খাবারের দোকান আর বিলাসী পণ্যের শোরুম। বেইলি রোডের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর পুনরুজ্জীবন জরুরি। মহিলা সমিতি মঞ্চে নিয়মিত সরকারি ভর্তুকি দেওয়া উচিত। পাশাপাশি সাগর পাবলিশার্স ও থিয়েটার কর্নারের মতো আরও বইয়ের দোকান গড়ে ওঠা প্রয়োজন।’

আশির দশকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘চরমপত্র’ পাঠ করে কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া সাংবাদিক ও সাহিত্যিক এম আর আখতার মুকুল তার ছেলের নামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাগর পাবলিশার্স। স্বাধীনতার পর আজাদ পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছিলেন এই প্রতিষ্ঠান, যা পরবর্তী সময়ে ঢাকার সাহিত্য আড্ডার অন্যতম তীর্থস্থানে পরিণত হয়। মুকুলের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা কিছুদিন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। পরে তারা বিদেশে স্থায়ী হলে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জুয়েল এর দায়িত্ব নেন।

তিনি দোকানটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেন। নাটকের টিকিট, নাট্যদলের ভর্তি ফরম ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাগর পাবলিশার্স। কিন্তু ২০২১ সালে জুয়েলের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় সাগর পাবলিশার্স। বেইলি রোড আজও আছে, নাটক সরণিও আছে। কিন্তু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির যে প্রাণস্পন্দন একসময় এই সড়ককে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল, তা যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে নগরায়ণের কোলাহলে। প্রশ্ন থেকে যায়— ঢাকার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যের এই কেন্দ্র কি আবারও ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুশ?