Image description

চাকরি হারিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. গোলাম সাকলায়েন। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখার সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সই করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

এর আগে ২০২৪ সালের ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে উপসচিব রোকেয়া পারভিন জুঁইয়ের সই করা এক চিঠিতে গোলাম সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়ে মতামত চেয়ে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চিঠি পাঠানো হয়।

কেন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো সাকলায়েনকে? শুধুই কেক খাওয়ার ছবি প্রকাশ্যে আসা নাকি অন্য কারণ? তথ্য সূত্র বলছে, স্ত্রী বাসায় না থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের ১ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক সেই অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনের রাজারবাগে সরকারি বাসায় গিয়েছিলেন নায়িকা পরীমনি। প্রায় ১৭ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন তিনি। 

অন্যদিকে ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাকলায়েন বিভিন্ন সময়ে পরীমনির বাসায় অবস্থান করেছেন। তার ও পরীর মোবাইল ফোনে আদান-প্রদানকৃত মেসেজ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথন সাধারণ পরিচিতি বা পেশাগত প্রয়োজনে স্থাপিত কোনো সম্পর্কের নয়; বরং অনৈতিক প্রেমের সম্পর্ক। পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখা থেকে দেওয়া সাকলায়েনের ফোনের সিডিআর থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

পুলিশ সূত্র বলছে, সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে পরীমণির সঙ্গে রাত্রিযাপন ও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টির জের ধরে। এর আগে ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০২১ সালের ১৪ জুন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পরীমনি। সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন গোলাম সাকলায়েন। সেই সূত্র ধরে সাকলায়েনের বাসায় যাতায়াত শুরু হয় পরীমনির।

এই ঘটনার মাস দুয়েক পর ৪ অগাস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। সেদিন এই চিত্রনায়িকা ও তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুকে আটক করা হয়। সেই রাতেই বনানী থেকে আটক করা হয় চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও তার ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকে। পরদিন তাদের বনানী থানায় হস্তান্তর করে তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইন ও পর্নগ্রাফি আইনে একাধিক মামলা করা হয়। সে সময় পরীমনির বাসায় অভিযান নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, ওই অভিযানের তিন দিন আগে তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েনের সরকারি বাসায় ‘প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় কাটান’ পরীমনি।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ আগস্ট সকালে পরীমনি নিজের গাড়ি নিয়ে সাকলায়েনের বাসায় যান এবং গভীর রাতে বেরিয়ে আসেন। অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠার পর গোলাম সাকলায়েনকে ডিবি থেকে বদলি করা হয়েছিল। পাশাপাশি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পায় ওই কমিটি। এরপর ২০২৪ সালের ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ তাকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানে’র বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসিতে) পরামর্শ চেয়ে চিঠি পাঠায়। এরই মধ্যে মতামত আসে পিএসসি থেকে। সেই মতামত অনুযায়ীই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল মন্ত্রণালয়।

পিএসসিতে পাঠানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, ডিবি গুলশান বিভাগের এডিসি থাকাকালে নায়িকা পরীমণির সঙ্গে ঘটনাক্রমে দেখা এবং যোগাযোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনি নায়িকা পরীমনির বাসায় নিয়মিত রাত্রিযাপন করতে শুরু করেন।

পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখা থেকে দেওয়া তার ফোনের সিডিআর অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে (দিনে ও রাতে) নায়িকা পরীমনির বাসায় অবস্থান করেছেন। তার ও পরীমনির মোবাইল ফোনে আদান-প্রদানকৃত মেসেজ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথন সাধারণ পরিচিতি বা পেশাগত প্রয়োজনে স্থাপিত কোনো সম্পর্কের নয়; বরং অনৈতিক প্রেমের সম্পর্ক।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, গোলাম সাকলায়েনের স্ত্রী বাসায় না থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের ১ আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নায়িকা পরীমনি তার (সাকলায়েন) রাজারবাগে সরকারি বাসায় যান। প্রায় ১৭ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। পরদিন ২ আগস্ট রাত ১টা ৩০ মিনিটে বাসা ত্যাগ করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, সাকলায়েন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে সরকারি দায়িত্বের বাইরে নায়িকা পরীমনির সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। বলা হয়, সাকলায়েন বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। এর পরও পরীমনির সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, পরীমনির সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন এবং নিজের সরকারি বাসভবনে নিজ স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটানোর মতো ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি বেশ আলোচিত হলেও আমার কাছে আপডেট নেই। সংশ্লিষ্ট শাখা ভালো বলতে পারবে। মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তালুকদার বিষয়টি নিয়ে টেলিফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কী আছে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রজ্ঞাপনে?
অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গোলাম সাকলায়েন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান। তিনি বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও পরীমনির সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন ও নিজের সরকারি বাসভবনে স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটানোর মত ঘটনা ঘটান। এসব ঘটনা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে আসায় সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

এতে আরো বলা হয়, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার ৩ (খ) বিধি মোতাবেক ‘অসদাচরণের’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর অভিযোগনামা ও অভিযোগের বিবরণী তার কাছে পাঠিয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়। তিনমাস পর অভিযোগনামার জবাব দেন সাকলায়েন। একই বছরের ২৩ অগাস্ট তার ব্যক্তিগত শুনানি হয়।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ, সাকলায়েন বর্তমানে পুলিশের ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত। তাকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসরের’ পাঠানোর ‘গুরুদণ্ড’ বুধবার অনুমোদন করেন রাষ্ট্রপতি।