কক্সবাজার আদালতের এক বিচারকের গানম্যানকে ১ লাখ ইয়াবাসহ আটক করে ওই ইয়াবা আত্মসাৎ ও অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনার প্রমাণ পাওয়ায় শেষ রক্ষা হলো না ওসি আফতাব উদ্দিনের। দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্ক ও নানা প্রশ্নের মুখে অবশেষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) রাত ৯টার দিকে তাকে কোতোয়ালি থানা থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সরবরাহ করা অকাট্য তথ্য-প্রমাণ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলেই ভেস্তে গেল আফতাবের দায়মুক্তির ‘কোটি টাকার মিশন’। কাজে আসেনি হুংকার দিয়ে বলা ‘উপরমহলের লম্বা হাতও’।
এর আগে তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ (এএসআই) আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন— উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না। এছাড়া মূল অভিযুক্ত কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন এবং সর্বশেষ গত ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এতো কিছুর পরও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তে ছিলেন ওসি আফতাব উদ্দিন।
বর্তমানে বরখাস্ত হওয়া আট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে, যার তদন্ত করছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা-পুলিশ কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ১ লাখ ইয়াবাসহ আটক করে। তবে এ ঘটনায় মামলা না করে উলটো ইয়াবাসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উদ্ধারকৃত বিশাল ইয়াবার চালানটি পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই আত্মসাৎ করেন। ঘটনার সময় বাকলিয়া থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন আফতাব উদ্দিন (পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওসি)।
ওসির প্রত্যক্ষ নির্দেশেই ইয়াবা বহনকারী কনস্টেবল ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
যেভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেন ওসি আফতাব
ইয়াবা কেলেঙ্কারির অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পর ১১ ডিসেম্বর যুগান্তরের প্রতিবেদক ওসি আফতাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন এবং তথ্য-প্রমাণ সরবরাহে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ওসি সব শুনে কোনো তথ্য না দিয়ে রহস্যজনকভাবে প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বরটি ব্লক করে দেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, আফতাব জড়িত সবাইকে ডেকে একটি বদ্ধ কক্ষে নিয়ে যান এবং পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করান— যেন মরে গেলেও এই ঘটনা কেউ স্বীকার না করেন।
ঘটনার শতভাগ তথ্য-উপাত্ত হাতে আসার পর গত ২২ ডিসেম্বর যুগান্তরে, চট্টগ্রামে উদ্ধার সোয়া ২ কোটি টাকার ইয়াবা গায়েব! শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের একটি আদালতে স্বপ্রণোদিত মামলার পাশাপাশি অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটিকে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ সরবরাহে সহযোগিতা করে যুগান্তর। এরপর ইয়াবাসহ ধরা পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন জড়িত কনস্টেবল। পরবর্তীতে ২৭ ডিসেম্বর যুগান্তরের তথ্যের ভিত্তিতে ‘দোষ স্বীকার কনস্টেবল ইমতিয়াজের, জড়িত দুই ইন্সপেক্টরসহ ১১ পুলিশ সদস্য’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় পরিদর্শক তানভীরসহ ১০ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত হলেও বহাল তবিয়তে থেকে যান প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ওসি আফতাব উদ্দিন।
ভেস্তে যায় ওসি আফতাবের কোটি টাকার মিশন
এদিকে ওসি আফতাব নিজেকে বাঁচাতে সাতকানিয়ার এক জামায়াত নেতা ও এক ছাত্রদল নেতার মাধ্যমে প্রতিবেদককে মোটা অঙ্কের ঘুসের প্রস্তাব দেন এবং তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষী না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। প্রতিবেদককে কোনোভাবে বশে আনতে না পেরে তিনি ‘কোটি টাকার মিশনে’ নামেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ট হিসেবে দেশব্যাপী আলোচিত রকি বড়ুয়ার মাধ্যমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাঁচার চেষ্টা করেন তিনি এবং কতিপয় সাংবাদিকদের মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তার পক্ষে পজিটিভ সংবাদ প্রকাশ করান নিয়মিত।
এ বিষয়ে রকি বড়ুয়ার মোবাইলে বেশ কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ওসি আফতাব আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ওসি আফতাবকে রক্ষায় তৎকালীন সিএমপি কমিশনার তদন্ত কমিটিকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলেও জানা যায়। মাদক আত্মসাতের ঘটনায় আইনের আওতায় আনার বদলে নানা সমালোচনা উপেক্ষা করে বাকলিয়া থেকে কোতোয়ালি থানায় বদলি করা হয়েছিল ওসি আফতাবকে।
যা বললেন সিএমপির কমিশনার হাসিব আজিজ
অভিযোগের বিষয়ে অবগত করে জানতে চাইলে সম্প্রতি বদলি হওয়া সিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাসিব আজিজ যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে, জড়িত থাকলে ওসি আফতাবকেও ছাড় দেওয়া হবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আপনি তো জড়িতদের শাস্তি চান; ওসি আফতাব বহাল, এটা তার শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তদন্ত শেষে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো প্রমাণ থাকলে আমাকে দিয়েন, আমি কী করি দেখেন। একটু সময় দেন, সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।
এদিকে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান। ঘটনা যেহেতু সিএমপি তদন্ত করছে, সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ওসির অপরাধ
মহানগর পুলিশের করা ৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ওসি আফতাব উদ্দিনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারার বিধান অনুযায়ী মাদকদ্রব্য–সংক্রান্ত অপরাধগুলো আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ওসি কোনো আইনি ব্যবস্থা নেননি। কোনো ব্যক্তিকে মাদকসহ আটকের পর মামলা না করে তিনি পিআরবির (বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান) ২৪৪ বিধি এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ওসি আফতাব উদ্দিন ইয়াবা গায়েবের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি, এমনকি ঘটনার প্রমাণ নষ্ট করতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংরক্ষণ করেননি। ওসির নির্দেশেই বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ ও অন্য আট পুলিশ সদস্য ইয়াবাসহ আটক ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেন। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশ করে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে এই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল।
যেভাবে আত্মসাৎ করা হয় ইয়াবা
যুগান্তরের অনুসন্ধান ও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মো. মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’-এর একটি বাসে উঠেন। এর বিনিময়ে তার ৮০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল। বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও পুলিশের এক সোর্স বাসে উঠে ঘুমন্ত ইমতিয়াজকে ডেকে তোলেন। ইমতিয়াজ নিজের পুলিশ পরিচয়পত্র দেখালেও তাকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বাসের সুপারভাইজার ও চালককে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ইমতিয়াজ জানান, পুলিশ বক্সে তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। সোর্স লাগেজটি খুললে ভেতরে প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট ১ লাখ ইয়াবা পাওয়া যায়। এ সময় ইমতিয়াজ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে পুলিশ সদস্যরা ইয়াবাগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে নেন এবং কাপড়চোপড়সহ খালি লাগেজটি ইমতিয়াজকে ফেরত দেন। এরপর ইমতিয়াজ নির্বিঘ্নে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে অলংকার মোড় হয়ে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি তা আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।
জড়িতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেলেও তদন্ত কমিটির স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি। আত্মসাৎ হওয়া ১ লাখ ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ; এমনকি গ্রেফতার হননি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত কোনো পুলিশ সদস্য বা মূল সরবরাহকারী মোশাররফ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির বর্তমান পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী যুগান্তরকে বলেন, মাদক কারবারি পুলিশ হোক বা সাধারণ জনগণ, আইনের চোখে সবাই সমান অপরাধী। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি আফতাবসহ জড়িত সবার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি প্রতিবেদন হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে, যেখানে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে কী নির্দেশনা আসে। আশা করি, দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারব, ইনশাআল্লাহ।