হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসবের সময় মাথায় আঘাত পেয়ে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জরায়ুতে অতিরিক্ত কাটা ও ‘দায়সারা’ সেলাইয়ের কারণে সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছেন প্রসূতি মা। এ ঘটনায় স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টায় জড়িতদের দায়ী করছেন জেলার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর ১২টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রসূতির স্বামী সাদ্দাম ঠাকুর (৩০)।
জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে সানজিদা আক্তারের (২০) প্রসববেদনা উঠলে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কর্তব্যরত নার্স ও মিডওয়াইফরা চিকিৎসা দেন। পরে মায়ের জরায়ু কেটে বাচ্চা প্রসবের প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু কাটা স্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পারায় তাকে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে নিয়ে গেলে মৃত সন্তান প্রসব হয়।
পরিবারের অভিযোগ, দিনভর অতিরিক্ত চাপ ও টানাহেঁচড়ার কারণে শিশুটির মাথা দুই পাশে চেপে গিয়ে পেছনের অংশ অস্বাভাবিকভাবে লম্বা হয়ে যায়। মায়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় তাকে সিলেটে রেফার করেন চিকিৎসকরা। কিন্তু দূরের পথ হওয়ায় সেখান না গিয়ে রাত সাড়ে বারোটার দিকে নেওয়া হয় হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার ইনসাফ হাসপাতালে। সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. এস কে ঘোষ প্রায় দুই ঘণ্টা অস্ত্রোপচার করে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার জরায়ুতে ৫০টির বেশি সেলাই দিতে হয়েছে এবং ছয় ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের একজনসহ তিনজন চিকিৎসক। তারা জানান, বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরায়ু অতিরিক্ত কেটে ফেলায় রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। এতে প্রসূতি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। ডাকে সাড়া দিচ্ছিলেন না। পাশাপাশি অদক্ষভাবে টানাহেঁচড়ার কারণে নবজাতকের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে তাদের দাবি।
চিকিৎসকরা মৃত সন্তান ও মায়ের অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টায় সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে সদর হাসপাতালে মৃত সন্তান প্রসবের পর জরায়ুর এক পাশের টিস্যু অন্য পাশে টেনে এনে সেলাই দিতে হয়েছে। ফলে দ্বিতীয়বার জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে এবং ছয় ব্যাগ রক্তের লেগেছে। আরও রক্ত লাগতে পারে বলেও তারা জানান।
রোগীর সঙ্গে থাকা ডা. মুবিন ঠাকুর বললেন, বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিকেল পর্যন্ত যখন প্রসবের চেষ্টা করেও ফল আসেনি। পরে স্বজনরা তাকে হবিগঞ্জে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু সেখানকার দায়িত্বরতরা জানান, দরকার নেই। এখানই বাচ্চা প্রসব করা সম্ভব। এখন এ দায় সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারেন না।
ডা. এস কে ঘোষ বললেন, প্রসূতি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তবে এখনও সংকট কাটেনি। জ্ঞান ফেরার পর অন্তত সাত দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
সাদ্দামের চাচাতো ভাই হুমায়ুন ঠাকুর জানান, এটা তাদের প্রথম সন্তান ছিল। নবজাতকের বাবা এখন বাকরুদ্ধ। মা এখনও অচেতন অবস্থায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামীমা আক্তারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলছিলেন, হাসপাতালে কর্তব্যরত নার্স ও মিডওয়াইফরা রোগীদের তড়িগড়ি করে রেফার করে দিতে চান বাড়তি চাপের ভয়ে। এই রোগীকে কেন তারা এত সময় দিয়েছেন অথবা কোনো অবহেলা রয়েছে কি না বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।