ফরহাদ জাকারিয়া
এমন এক সময়ে জাতীয় বাজেট পেশ করা হলো, যখন ব্যাংক খাতে অস্থিরতা বিরাজমান। এ সময়ে খাতটি ঘিরে বাজেটে এমন আশার আলো থাকা বরং দরকার ছিল, যাতে অস্থিরতা প্রশমিত হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে খাতটি। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে আমানতের ওপর আবগারি শুল্কে ছাড় এবং সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুঁজি জোগাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া ছাড়া চোখে পড়ার মতো সুখবর নেই বললেই চলে। বরং ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) ঘিরে যে প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তাতে খাতটিতে সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে হয়।
এতে সাম্প্রতিক অস্থিরতায় যেসব গ্রাহক হিসাব বন্ধ করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন, তাদের পুনরায় ব্যাংকে ফিরে আসার পথ কঠিন হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোয় যে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, তা গভীরতর হওয়ার পথ তৈরি হবে। অস্বীকার করা যাবে না, আয়কর ও টিআইএন ঘিরে জনসাধারণের মধ্যে একটা ভীতি রয়েছে এবং তা রাতারাতি দূর করাও সম্ভব নয়। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের কারণে মানুষ যদি ব্যাংকবিমুখ হয়, তাহলে বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বাড়বে। গ্রাহকদের মধ্যে হিসাব বন্ধ করে ফেলার প্রবণতা বাড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অর্থমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবের পেছনে উদ্দেশ্য হয়তো করভিত্তি বিস্তৃত করা। কিন্তু এতে শুধু ব্যক্তিরই ব্যাংক বিমুখতা বাড়বে না; বিশেষ প্রয়োজনে যাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়, তারাও পড়তে পারেন বিপাকে। যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ছোট বিনিয়োগ নেওয়ার জন্য ব্যাংকে আসতেন, এখন তাদেরও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে টিআইএন। অন্যদিকে যারা ক্ষুদ্র আমানতকারী, তাদেরও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে এটি।
এমন সিদ্ধান্ত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি এবং সঞ্চয় প্রবণতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মনে রাখা জরুরি, অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে গেছে অনেকটাই। তারপরও একশ্রেণির মানুষ অনেক কষ্টে সঞ্চয় করেন ভবিষ্যতের জন্য। এই পরিস্থিতিতে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে দেখা যাবে, তাদের সঞ্চয়ের অভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। যারা ব্যাংকের ডিপোজিট স্কিমে সঞ্চয় করতেন, তারা দেখা যাবে সেই টাকা ব্যবহার করছেন অন্য কোনো ক্ষেত্রে। এজন্য মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহ জোগাতে আবগারি শুল্কে ছাড় দেওয়ার মতোই টিআইএনের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
কী ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন লাগবে, অর্থমন্ত্রী অবশ্য সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু বলেননি। ধরে নেওয়া যায়, যেকোনো ধরনের হিসাব খুলতেই এই সনদের প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয় ভেবে দেখতে হবে তা হলো, সঞ্চয়ী হিসাব কিংবা মেয়াদী আমানত অথবা মাসিক ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস)– একেকটি হিসাব খোলার পেছনে একেক উদ্দেশ্য থাকে। করদাতাদের উৎসাহ জোগাতে ডিপিএসে বার্ষিক এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমার ওপর কর রেয়াত নেওয়ার বিধান আছে। এর বাইরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ডিপিএস করে আয়ের একটি অংশ বাঁচিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় এবং নিজ আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতে। হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে করদাতাদের বাইরে যে বিপুল জনগোষ্ঠী ডিপিএসে টাকা সঞ্চয় করে, তাদের ব্যাংকমুখি করাও চ্যালেঞ্জিং হবে। এই ইস্যু ঘিরে মানুষ যাতে ব্যাংক আমানতে নিরুৎসাহিত না হয়, সেজন্য বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবনা জরুরি।
একই কথা প্রযোজ্য মেয়াদী আমানতের ক্ষেত্রে। মেয়াদী আমানত খোলার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখতে হয়। কথা হলো, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই টাকা সঞ্চয় করে দীর্ঘদিন ধরে। আরও একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন– মেয়াদী আমানত থেকে প্রাপ্ত মুনাফার ওপর তারা নির্ভরশীল। আবার কেউ কেউ মেয়াদী আমানত রাখেন ভবিষ্যতের কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ করার উদ্দেশ্যে। বাস্তবতা হলো, ব্যাংকের এমন গ্রাহকদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের করযোগ্য আয় নেই। এখন কথা হলো, ডিপিএস কিংবা মেয়াদী আমানত খোলার জন্য তাকে যদি টিআইএন করতে এবং বছর বছর রিটার্ন জমা দিতে হয়, তাহলে এ শ্রেণীর মানুষ সহজে চাইবে না ওইসব আমানতের কোনো হিসাব খুলতে। বরং তারা চাইবে টাকাটা অন্য কোনো খাতে স্থানান্তর করতে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাড়তি মুনাফার প্রলোভন পা দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতারিত হওয়ার খবর পাওয়া যায় অহরহ। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন নাম্বারের বাধ্যবাধকতা থাকলে মানুষকে ব্যাংকবিমুখ করা প্রতারকদের পক্ষে সহজতর হবে এবং সে ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হতে পারে সঞ্চয়ের নিরাপত্তা। এটা অবশ্য কারও উদ্দেশ্য হওয়ার কথা নয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণের জন্য করভিত্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ওইসব মানুষকে এর আওতায় এনে কর আহরণ কতটা বাড়ানো যাবে এবং সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্তটি আদৌ ইতিবাচক কিনা, তা ভেবে দেখা জরুরি।
দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখনও রয়েছে আর্থিক খাতের বাইরে। তাদেরকে এ খাতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তারপরও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মানুষকে যে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করা গেছে, তা নয়। ব্যাংকের বিষয়ে স্বভাবতই কিছু মানুষের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। নিকট অতীতে কিছু ব্যাংক জনসাধারণের আমানত চাহিদামতো ফেরত দিতে না পারায় খাতটির প্রতি আস্থা দুর্বল হয়েছে আরও অনেকের। বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটিতে সৃষ্ট অস্থিরতাও এর অন্যতম প্রধান কারণ। এমন পরিস্থিতিতে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা দিলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে যারা রয়েছে, তাদেরকে এতে আনা হবে অনেক কঠিন। ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার জন্য আরও বেশি মানুষকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আলোচিত প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে সে প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে।
মনে রাখা জরুরি, বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় যারা কর্মরত, প্রতিবছর তাদেরকে হিসাব খোলার জন্য টার্গেট পূরণ করতে হয়। এর ওপর নির্ভর করে তাদের সুযোগ-সুবিধা ও প্রমোশন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের পক্ষে টার্গেট অর্জন করা হয়ে উঠবে সুকঠিন। অর্থাৎ এ সিদ্ধান্তে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে খাতটিতে কর্মরতদেরও।
আমাদের দেশে ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা কিংবা তার বেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ নেওয়ার বিধান রয়েছে। এটি চালু হয়েছে কয়েক বছর আগে। দুই লাখ টাকা বা তার বেশি অংকের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে একই ধরনের বিধান। তবে আমানত হিসাব খোলায় এ ধরনের বাধ্যবাধকতা ছিল না কখনো। এজন্য বিষয়টি পর্যায়ক্রমে চালু করা যায় কিনা বা নির্দিষ্ট পরিমাণের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে চালু করা যায় কিনা, সেটাও ভেবে দেখা জরুরি।
অবশ্যই মনে রাখা দরকার, ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা কমে গেছে অনেকটাই। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলমান অস্থিরতায়ও খাতটিতে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য সংকট। এ অবস্থায় নতুন বিধান করে মানুষকে ব্যাংকবিমুখ করা হলে খাতটির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অনেক কঠিন হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, ব্যাংক খাতে বিদ্যমান অস্থিরতার জন্য অন্যতম প্রধান দায়ী খেলাপি ঋণ। অর্থমন্ত্রী অবশ্য তাঁর বক্তব্যে এটা স্বীকার করেছেন। এর উল্লেখযোগ্য অংশ পাচার হয়েছে বিভিন্ন উপায়ে। এসব টাকা কী উপায়ে ফেরত আনা যাবে এবং ব্যাংকগুলো কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে; যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় ছিল না। কথা হলো, আগের সরকারের আমলে কিছু আইনি শিথিলতার কারণে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয় পরিচালকদের পারিবারিক প্রভাব বেশি রাখার সুযোগ তৈরি হয়। এটা যাতে কমানো যায় এবং এ লক্ষ্যে আইন সংশোধন করা যায় কিনা, সেটিও ভেবে দেখতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা চাই, আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। এজন্য সরকারের বরং উচিত হবে আর্থিক খাতে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা কমানোর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। নতুনভাবে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয় এবং এর প্রভাব যাতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে না পড়ে, সেদিকেও রাখতে হবে দৃষ্টি।
হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে সরকার করভিত্তি বিস্তৃত করতে কিছুটা সক্ষম হবে হয়তো। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আরেকটি জনগোষ্ঠী থেকে যেতে পারে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তির বাইরে। এজন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিও জরুরি। সরকার চাইলে অবশ্য এ লক্ষ্যে নিতে পারে উদ্যোগ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে কিছু উদ্যোগ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। টিআইএন খোলার প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে পারে কিনা, সেটিও ভেবে দেখতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টির পর এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে বরং সরকারের উদ্দেশ্য সফল হতে পারে। তখন জনমনেও তৈরি হবে না বাড়তি কোনো ভীতি।
প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য বরাদ্দ থাকায় খাত সংশ্লিষ্টরা খুশি হলেও যাদের কর থেকে এই টাকা আসে, তাদের সচেতন অংশটি খুশি হয় না কখনোই। যারা কর প্রদান করে, তাদের উদ্দেশ্য থাকে সরকার থেকে এর বিনিময়ে কিছু সুবিধা পাওয়ার। জনসাধারণের কর যখন প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় না হয়ে বরং পাচার হওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে সহায়তা জোগানোর জন্য বরাদ্দ হিসেবে দেওয়া হয়, তখন করদাতাদের মধ্যেও তৈরি হয় আস্থার ঘাটতি। এতে কর প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে তাদের অনেকেই। এ অবস্থায় এই ধরনের সহায়তা যাতে প্রতিবছর বাজেটে জোগাতে না হয়, সে লক্ষ্যে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে বরং বেশি করে মনোযোগ দেওয়া উচিত সরকারের।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা