সারা দেশে ‘১০০ দিনে ৬০৫ খুন’ শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।
বাহিনীটির দাবি, প্রকাশিত তথ্যের পেছনের কারণভিত্তিক বিশ্লেষণ, জনসংখ্যার অনুপাতে হার এবং অতীতের পরিসংখ্যানগত প্রেক্ষাপট উপস্থাপন না করায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। ফলে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক নয়, বরং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দ্বন্দ্বের ফল বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
সোমবার (৮ জুন) এক বিশ্লেষণধর্মী বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উদ্ধৃত করে ‘১০০ দিনে ৬০৫ খুন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপর সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে তারা কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলে দেশে মোট ৬০৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৩৩৬টি পূর্বশত্রুতাজনিত, ১৪৬টি পারিবারিক কলহের কারণে এবং ৬৯টি সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে।
এ ছাড়া আকস্মিক আঘাতে ১৯টি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৯টি, প্রেম বা পরকীয়ার কারণে ৫টি এবং ছিনতাইকারীদের হাতে ৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। দাঙ্গা, দস্যুতা, অপহরণ ও অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে আরও ১৫টি হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হত্যার সংখ্যা ৩টি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক ঘটনার হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে অধিকাংশ ঘটনাই ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
পুলিশের দাবি, গত দুই মাসে নথিভুক্ত ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডকে বার্ষিক হিসাবে রূপান্তর করলে সম্ভাব্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৩০। গত এক দশকে দেশে প্রতিবছর হত্যা মামলার সংখ্যা সাধারণত ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। ফলে বর্তমান সংখ্যাকে অতীতের প্রবণতার তুলনায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি।
জনসংখ্যার অনুপাতে হত্যার হার সম্পর্কেও বক্তব্য দিয়েছে পুলিশ। তাদের হিসাবে, প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে গত দুই মাসে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে হত্যার হার দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩৪। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ হারকে উচ্চমাত্রার বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অপরাধ পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মোট সংখ্যা নয়, বরং ঘটনার কারণ, ঐতিহাসিক প্রবণতা এবং জনসংখ্যাভিত্তিক হার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় উপেক্ষা করে কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
পুলিশের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে অতীতের সমপর্যায়ের সময়ের হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি। একই সঙ্গে কোন ধরনের হত্যাকাণ্ড কত শতাংশ এবং কী কারণে সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনুপস্থিত ছিল।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে অধিক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তাদের মতে, মামলা নিবন্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধিরও প্রতিফলন হতে পারে।
পুলিশ বলেছে, অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিবিন্যাস, ঐতিহাসিক তুলনা এবং জনসংখ্যাভিত্তিক হার তুলে ধরা হলে জনগণ আরও বাস্তবসম্মত চিত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন।
হত্যাকাণ্ডের কারণভিত্তিক চিত্র তুলে ধরে পুলিশ সদর দপ্তর দাবি করে, পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক বিরোধ, আকস্মিক আঘাত, আধিপত্য বিস্তার, প্রেম ও পরকীয়ায় অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাকিটা ছিনতাইকারী কর্তৃক ১ ভাগ, দাঙ্গা, দস্যুতা, অপহরণ ও অন্যান্য ২ দশমিক ৪ ভাগ, রাজনৈতিক শূন্য দশমিক ৫ ভাগ।
এ নিয়ে বিবৃতিতে মোট ৬০৫ বা শতভাগ হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।