জীবনযাত্রার ‘বিরতিহীন’ ব্যয় বৃদ্ধি, সীমিত আয় এবং সঞ্চয়ের অভাবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ ক্রমেই ঋণের ফাঁদে আটকে পড়ছে। পরিবারের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে, সন্তানদের বিয়ে, শিক্ষা কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত খরচ মেটাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করছেন, কেউবা সুদে টাকা ধার নিচ্ছেন কিংবা এনজিও ও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা মেটাতেই অনেক পরিবার ঋণে জর্জরিত হয়ে পথে বসে যাচ্ছে। অনেকে ঋণের বোঝা সইতে না পেরে আত্মগ্লানি থেকে আত্মহত্যার মতো সর্বনাশী পথও বেছে নিচ্ছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও যেসব পরিবার সামান্য হলেও সঞ্চয় করতে পারত, এখন তাদের বেশির ভাগই মাসিক আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। পাশাপাশি বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যয় আকাশচুম্বী হলেও বাড়েনি আয়। সীমিত আয় ও সীমাহীন ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম সাধারণ মানুষ। সঞ্চয় তো দূরের কথা, এখন পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতেই গলদঘর্ম।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশের কৃষক আবদুল করিম বলেন, ‘দুই বছর আগে স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য ধার করতে হয়। পরে সেই ঋণ শোধ করতে জমি বিক্রি করেছি। এখন আবার ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক রুবিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘বেতন সামান্য বাড়লেও বাজারের খরচ আরও অনেক বেশি বেড়েছে। কোনো জরুরি খরচ এলেই আত্মীয়স্বজন বা এনজিওর কাছ থেকে ধার নিতে হয়। ঋণ শোধ করতে গিয়ে আবার নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে।’ ঢাকায় ধোলাইপাড়ের বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আলতাফ হোসেন জানান, ‘বেতন যা পাই, তা দিয়ে মাসের ২০ তারিখের পর আর চলা যায় না। বাড়ি ভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন আর কাঁচাবাজারের খরচ দিতেই পকেট খালি। সঞ্চয় করব কী, প্রতি মাসেই পরিচিতদের কাছ থেকে কিছু না কিছু ধার করতে হচ্ছে।’ অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ নানা কারণে ঋণের জালে আবদ্ধ হচ্ছে। অতিরিক্ত খরচের চাপে তাদের আপৎকালীন সঞ্চয় বা ডিপিএস ভেঙে ফেলতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এখন অনেক পরিবারকে নীরবে ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ-এই তিনটি খাতেই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিত্যপণ্যের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি প্রয়োজন, পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তৃতিও জরুরি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতন আর্থিক পরিকল্পনা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।’ পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বিপদের মাত্রা রূপ নিচ্ছে চরম ট্র্যাজেডিতে। দেশের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সরকারি হাসপাতালে সিট না পাওয়া বা ওষুধের বাড়তি দামের কারণে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারগুলো। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতি বছর শুধু চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। চড়া সুদে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতে হচ্ছে, যা পরবর্তীতে আর শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের আর্তনাদ যেন দেখারও কেউ নেই! কান্নাজড়িত কণ্ঠে পোশাক শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার স্ত্রীর জরায়ু অপারেশনের জন্য ১ লাখ টাকার দরকার ছিল। কোনো সঞ্চয় না থাকায় গ্রামের সুদের কারবারির কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিতে হয়েছে। এখন প্রতি মাসে যে সুদ দিতে হচ্ছে, তা আমার বেতনের অর্ধেক।’ বাঙালি সমাজে বিয়ে বা যেকোনো জরুরি সামাজিক অনুষ্ঠান এখন আনন্দের চেয়ে সীমাহীন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারে কারও বিয়ে মানেই পরিবারের কর্তার কাঁধে ‘ঋণের বোঝা’। লোকলজ্জা আর সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাগিদে সাধ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এই বাড়তি খরচ সামলাতে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন নিজেদের শেষ সম্বল চাষের জমি বা বসতভিটা বিক্রি করতে।
বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে কন্যাসন্তানের বিয়ে কিংবা জরুরি কোনো পারিবারিক সংকট কাটাতে পানির দামে জমি বিক্রি করে দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পর এসব পরিবারের উপার্জনের পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে অনেকেই রাতারাতি ‘পথের ফকির’ হয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা এবং মানসিক অবসাদ আরও বাড়বে। ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গার চিত্র একই। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কৃষক আবদুল জলিল জানান, গত মৌসুমে ফসলের ভালো দাম পাননি। অথচ সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। মেয়ের বিয়ের খরচ মেটাতে শেষ পর্যন্ত এক টুকরা জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ায় মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। এতে পরিবারগুলো আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। কোনো আকস্মিক বিপদ এলেই তারা ঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে।