সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য কেউ রাতভর গোপন ‘বুথে’ বসে মুখস্থ করেছেন ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর, কেউ আবার মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটার সুবিধা। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নিয়োগব্যবস্থার ভিতরে গড়ে ওঠা এমন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ চক্রের হাত ধরে শত শত প্রার্থী মেধা ডিঙিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, যার বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে কোটি কোটি টাকা।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভুয়া সনদ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক অনুসন্ধানে সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থার এ অন্ধকার চিত্র সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ৯ জুন রাজধানীর পল্টন থানায় করা প্রশ্নফাঁস মামলার তদন্ত শেষে গত ১৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছেন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপপরিদর্শক (এসআই) নিপ্পন চন্দ্র চন্দ।
তিন দশকের প্রশ্নফাঁস বাণিজ্য : আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির অভিযোগপত্রের তথ্যানুযায়ী, পিএসসির বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩০ বছর ধরে সক্রিয় ছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন ও অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা। তদন্তে বলা হয়েছে, বিসিএস থেকে শুরু করে রেলওয়ে, বিআরটিএ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন আগেভাগে সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। পদভেদে একজন প্রার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হতো ৭ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
প্রশ্নফাঁস থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ : সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের অর্থে চক্রের সদস্যরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সৈয়দ আবেদ আলীর নামে ও তার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবগুলোতে ৪১ কোটির বেশি টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম ছাত্র হলেও বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার এবং একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা গড়ে তোলেন। পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলামের কাছ থেকে গ্রেপ্তারের সময় নগদ ৭১ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। এ ছাড়া পিএসসির উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৩ কোটি টাকা এবং চক্রের সদস্য আবু সোলায়মান মো. সোহেলের বিভিন্ন হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা জমার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
‘বুথে’ বসে প্রশ্ন মুখস্থ : তদন্তে উঠে এসেছে চক্রটির সবচেয়ে আলোচিত কৌশল-গোপন ‘বুথ’। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বাসাবো ও এজিবি কলোনির বিভিন্ন বাসা ও আবাসনে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার এক থেকে দুই দিন আগে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর সারা রাত ধরে মুখস্থ করানো হতো। পরীক্ষার দিন ভোরে তাদের সরাসরি কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হতো। ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন ১৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হওয়ার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। একইভাবে রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার আগে কয়েক ডজন প্রার্থীকে সাভারের পালমিরা রিসোর্টে রেখে প্রশ্ন ও উত্তর পড়ানো হতো।
প্রশ্ন পেয়ে পুলিশ ক্যাডার! : অভিযোগপত্রের অন্যতম আলোচিত তথ্য হলো ৩০তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে ঘিরে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৈয়দ আবেদ আলীর মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে তিনি পুলিশ ক্যাডারে চাকরি পান। পরে তিনি নিজেও প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। জানতে চাইলে জাকারিয়া রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রশ্নফাঁসের কোনো কিছুর সঙ্গে তার সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজির (মিডিয়া) সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান।
পিএসসির ভিতর থেকেই বের হতো প্রশ্ন : তদন্ত অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের সুসংগঠিত নেটওয়ার্কটির শেকড় ছিল পিএসসির ভিতরেই। সাজেদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন পিএসসির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন। এমনকি ২০২৪ সালে রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পিএসসি সদস্যের চেম্বারে রাখা ট্রাঙ্ক থেকে চুরি করে ফটোকপি করার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
এবার নজরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ : মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভুয়া সনদ ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে মাঠে নেমেছে দুদক। সংস্থাটির সূত্র বলছে, বিভিন্ন বিসিএস এবং সরকারি দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের সনদ যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ভুয়া বা জাল সনদ ব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। দুদক ইতোমধ্যে ৩৮তম থেকে ৪৩তম বিসিএস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে নবম বিসিএস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোটার সুবিধা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশকারীদের তথ্যও যাচাই করছে। পানগাঁও কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার সাবরিনা আমিনের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ার তথ্য পায় দুদক। তার বাবা আমিনুল ইসলামের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের সঠিকতা যাচাইয়ে অধিকতর অনুসন্ধান শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৭ এপ্রিল ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় ভুয়া সার্টিফিকেটে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি।
এদিকে গত বছরের ২৯ মে দুদকে জমা হওয়া এক অভিযোগ থেকে জানা যায়, জাল ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দাখিল করে এলজিআরডি অডিট অধিদপ্তরে চাকরি নেন গোপালগঞ্জ মুকসুদপুরের মাহমুদুল হাসান মামুন নামে এক ব্যক্তি। এর আগে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর মাহমুদুল হাসান মামুন ও তার স্ত্রী তানজিন ফারহার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করেন দুদকের উপপরিচালক মাহবুবুল আলম। জানতে চাইলে মাহমুদুল হাসান মামুন এ প্রতিবেদককে বলেন, দুদক আমার ও আমার স্ত্রীর বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান করছে কি না তা জানা নেই। আর আমার বাবার নাম লাল মুক্তিবার্তায় রয়েছে। অতএব মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ভুয়া নয়।