সীমান্ত জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের একের পর এক পুশইন চেষ্টায় সীমান্ত এলাকায় এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্থানীয় জনগণকে
সঙ্গে নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি বিএসএফের এই তৎপরতা রুখে দিচ্ছে। বিএসএফের পুশইন চেষ্টার কারণে সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। একইসঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, দেশের ২৬ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুশইনের চেষ্টা হতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শেরপুর সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এসব জেলার সীমান্তে সাধারণ মানুষও সতর্ক পাহারায় রয়েছেন। কোনো কোনো এলাকার বাসিন্দারা রাত জেগে পাহারাও দিচ্ছেন। সীমান্তে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনের সম্মেলন। এই সম্মেলনে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে। আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী গত কয়েকদিনে ২০টিরও বেশি পুশইনের চেষ্টার ঘটনা ঘটে। এসব পুশইন চেষ্টা বিজিবি ব্যর্থ করে দিয়েছে। ওদিকে সরকারের তরফেও পুশইন চেষ্টার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এ নিয়ে ভারত সরকারকে একাধিক চিঠিও দেয়া হয়েছে।
ভারত থেকে যেভাবে লোকজনকে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে তা ‘একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়’ মন্তব্য করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, অবৈধ কেউ থেকে থাকলে তাদের ফেরাতে ‘কূটনৈতিক প্রক্রিয়া’ মানা উচিত দু’দেশেরই। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেছেন, “যত রকম ডিপ্লোম্যাটিক নর্ম আছে, সেটা আমরা ফলো করছি। আমরা রেগুলারলি তাদেরকে যখনই পুশইনের ঘটনা আমাদের কানে আসছে বা আমরা দেখছি, রিপোর্টিং হচ্ছে, আমরা কিন্তু তাদেরকে চিঠি দিচ্ছি। আমরা আশা করবো যে ভারত সরকার, এটা তারা সিরিয়াসলি নেবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ ম্যাকানিজম এবং ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে আমাদের এই কাজটি তারা সমাধান করবে।
ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ১২ থেকে ১৩টা চিঠি দিয়েছি দিল্লিতে। বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবে এটা আমরা অ্যালাও করছি না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রোববার বলেছেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে স্থাপিত আটক শিবির থেকে প্রায় চার হাজার ৮০০ জন ‘অবৈধ অভিবাসী’কে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
গভীর রাতে পুশইন করা ১০ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, তিনদিন পর পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে চরম অমানবিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা ও আতঙ্কের অবসান হয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে এ সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা পুশইনকৃত ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বিএসএফ সরিয়ে নিয়ে গেছে। এতে বিজিবি ও সীমান্তবাসী স্বস্তি প্রকাশ করেছে। শূন্যরেখা সংলগ্ন একটি কৃষিজমিতে ৭০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ওই নারী-পুরুষ ও শিশুরা খোলা আকাশের নিচে অর্ধাহারে অনাহারের পাশাপাশি সূর্যের প্রচণ্ড তাপ ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে অবস্থান করে। তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও কষ্ট দেখে বাংলাদেশি সীমান্তবাসীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সে সঙ্গে বিজিবি’র সঙ্গে সীমান্ত পাহারায় অনেকে কাটিয়েছে নির্ঘুম রাত।
সোমবার সকালে ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে ওই সীমান্তে দেখা যায়নি। আগের মতো বিজিবি ও বিএসএফের অতিরিক্ত সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল না। স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার ভোর থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তি সীমান্ত সংলগ্ন একটি কৃষিজমিতে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে তারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটান। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমরা বিজিবি’র সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় পাহারা দিচ্ছিলাম। রাত ১২টার দিকে বিএসএফ তাদের সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়। পরে রাত প্রায় আড়াইটার দিকে তারা কাঁটাতারের গেট খুলে ওই লোকজনকে সেখান থেকে নিয়ে যায়। নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিএসএফ আমাদের সঙ্গে কথা বলে রাত আড়াইটার দিকে তাদেরকে সেখান থেকে নিয়ে গেছে।
চুনারুঘাট সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে বিজিবি’র টহল জোরদার:
চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের পুশইনচেষ্টার প্রেক্ষিতে চুনারুঘাট সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বিজিবি। হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ সকল সীমান্ত ফাঁড়ির জোয়ানদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। কোনো কোনো এলাকায় মাইকিং করে সীমান্তবাসীকে সচেতন করা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত কোনো পুশইন বা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। গত ২৫শে মে পাহাড়ঘেরা কালেঙ্গা সীমান্তের ৫৫ এর ৯ সাব-সীমান্ত পিলার বরাবর নারী-শিশুসহ ১৯ জনকে পুশইন করে বিএসএফ। তারা ত্রিপুরা রাজ্যে একটি ভাটার শ্রমিক ছিলেন। তারা সেখানে বিগত ১৫ বছর ধরে কাজ করে আসছিলেন। চুনারুঘাট উপজেলার সবক’টি সীমান্ত ঘন পাহাড় ও চা বাগানঘেরা। চুনারুঘাটে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা গহিন জঙ্গলে আবদ্ধ। বাল্লা বিওপি’র সামান্য অংশ জঙ্গলমুক্ত। ২০০৫ সালে পুরো ত্রিপুরা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয় ভারত সরকার। কালেঙ্গা সীমান্তে ডেবরাবাড়ি এলাকাটি গহিন পাহাড় বেষ্টিত থাকায় এখানে তারের বেড়ার আওতায় আসেনি পুরো সীমান্ত। মূলত এলাকাটিতে নজরদারি জোরদার করলে অনুপ্রবেশ ঠেকানো বহুলাংশে সম্ভব বলে এলাকাবাসীর মনে করেন। চুনারুঘাট সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নানা সতর্কতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিজিবি।
শনিবার গভীর রাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতামূলক মাইকিং করে ৫৫ বিজিবি। এ ছাড়া উঠান বৈঠকের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে পুশইনের ঝুঁকি, সন্দেহজনক তৎপরতা শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত বিজিবিকে জানানোর বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি’র সদস্যরাও অংশ নিচ্ছেন। বিজিবি’র ৫৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রতিটি বিওপিতে টহল জোরদার ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সীমান্তের প্রতিটি অংশ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। রাত্রিকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না।
দৌলতপুর সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে যৌথ টহল:
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে পুশইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যৌথ টহল অব্যাহত রেখেছে বিজিবি-জনতা। কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। সেইসঙ্গে বিএসএফের পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকার জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। দিনরাত টহল কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় এ সীমান্ত দিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো পুশইন বা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে। শনিবার গভীর রাতে উপজেলার প্রাগপুর কবরস্থানপাড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সীমান্ত লাইট বন্ধ করে কাঁটাতারের বেড়ার পকেট গেট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয় জনতা তা প্রতিহত করেছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ৪৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। পুশইন বিষয়ে কুষ্টিয়া (৪৭ বিজিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুশইন সম্পর্কিত যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা রোধে সবসময়ের জন্য সতর্ক অবস্থানে আছে।