ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীর ভাসমান চায়ের দোকান চুরির অভিযোগ তুলে এক রিকশা চালকের রিকশা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দোকানি শিক্ষার্থী এবং তার বন্ধু ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। যদিও অভিযোগের বিষয়ে দায় নিতে রাজি নন কেউই। উল্টো একে অপরকে দুষছেন তারা।
এ ঘটনায় থানায় ভুক্তভোগী রিকশা মালিক ও চালক থানায় মামলা করতে গেলে ঘটনার জানাজানি হয়। রবিবার (৭ জুন) এ ঘটনার সাথে জড়িত মো: মেহেদী হাসান ছাত্রদল নেতাকে অভিযুক্ত করে এ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলে শুরু হয় সমালোচনা।
অভিযুক্ত দুই জনই ঢাবির ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের একজন ফারসি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং জসিম উদ্দীন হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইমদাদুল হক মিলন। অন্যজন হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো: মেহেদী হাসান।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো: মেহেদী হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে একটি দোকান চালাতেন। গত ৪ মে তার এই দোকান চুরি হলে থানায় অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার বিষয়ে জেনে তারই কলেজ বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মিলন তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। এর পরের দিন মেহেদী ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহভাজন রিকশা চালক জাকিরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পাশে গাঁজা সেবন করতে দেখেন এবং রিক্সা নিয়ে বন্ধু মিলনের কাছে যান। পরে তারা ক্ষতিপূরণ পেতে রিক্সা বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী চালক থানায় অভিযোগ জমা করে এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ ২০ হাজার টাকা দাবি করে। এ ঘটনার পরে বন্ধু ছাত্রদল নেতাকে দায়ী করে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ফেসবুক গ্রুপ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ-২’ এ পোস্ট করেন মো: মেহেদী হাসান।
ঘটনার বর্ণনার এক পর্যায়ে মাহাদী হাসান ফেসবুকে লেখেন, তখন মিলন ও মেহেদীরা (স্থানীয় আরেক ছাত্রদল নেতা) এসে রিকশা চালক ও রিকশা নিয়ে শহীদ মিনার সংলগ্ন মাজারে যায়। আমার পুনঃভর্তির কাজ থাকায় আমি রেজিস্টার বিল্ডিং চলে আসি। কাজ শেষে আমি মাজারে ফিরে আসলে দেখি তারা চোরসহ খাবার খাচ্ছে। মিলন আমাকে বলে চোর ধরতে ছেলেদের অনেক পরিশ্রম হয়েছে তুই ওদের নাস্তা খরচ ১০ হাজার টাকা দে। আমি তখন বলি টাকা দেওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। আমার কাছে টাকা না পেয়ে তারা রিকশা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তাদের নিষেধ করি। কিন্তু মিলন আমার কথা না শুনে চোরের একটা ছবি তুলে মেহেদীসহ পলাশী যায় এবং ফিরে এসে জানায় যে এই চোর চুরির সাথে জড়িত। তাই এর রিকশা বিক্রি করে তোর ক্ষতিপূরণ আর আমাদের নাস্তার টাকা হবে। আমি তখন বলি যে রিকশা না বিক্রি করে কোথাও দুই তিন দিন রেখে দাও যাতে ওর গ্যারেজ মালিক আসলে ক্ষতিপূরণ নিয়ে রিকশা দেওয়া যায়। কিন্তু মিলন সেটা না করেই রিকশা আর কয়েকজন ছেলে নিয়ে চলে যায়। আমি প্রায় দুই তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করি ওদের জন্য। পরে মিলন ফোন করে জানায় ঝামেলা হয়েছিল তাই তারা রিকশা বিক্রি করতে বাধ্য হয় এবং আমার নাম্বারে ৫ হাজার টাকা বিকাশ করে পাঠায়। আমি তাকে বলি রিকশা বিক্রি করলি এখন তো ঝামেলা আমার আরো বেড়ে গেলো। সে বলে কিছু হবেনা সব আমরা দেখবো। পরে ৬ তারিখ সেই রিকশার চালক ও মহাজন শহীদ মিনার এলাকায় আমাকে আক্রমণ করলে আমি থানায় গিয়ে আর একটি অভিযোগ করি এবং মিলন কে বলি সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু মিলন সেটা না করে উল্টো আমাকে তার নাম বললে মারবে, ক্যাম্পাসে থাকতে দিবে না, বিপদে ফেলবে বলে হুমকি দেয় ও ব্লক করে দেয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন কথা বলছেন ছাত্রদল নেতা ইমদাদুল হক মিলন। তিনি বলেন, ওই দিন সে রিকশা নিয়ে নিমতলায় আমার বাসার সামনে চলে আস। এসে আমাকে বলে যে, এ রিক্সাই নাকি তার দোকান চুরি করছে। পরে আমি স্থানীয় পোলাপানকে কল দেই। বলি যে, এই চোর -এখন কি করা যায়? তারা আমাকে পরামর্শ দেয় যে, উনার যেহেতু রিএডমিশনের জন্য জরুরি টাকা লাগবে তাই এই রিকশা কোথাও বন্ধক রেখে উনাকে ভর্তির টাকাটা দেই। পরে রিকশা মালিকরা এসে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিবে। তখন থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তারা চেষ্টা করছে কিন্তু এই সিস্টেমে তারা রিকশা বিক্রি করতে পারেনি। পরে আমি চলে আসি। এ আবার খুবি চাপ দিয়েছে বিক্রি করে দিতে। তার টাকার প্রয়োজন তা না হলে ভর্তি হতে পারবে না। পরে তারা একজায়গায় ১০ হাজার টাকায় ওটা বিক্রি করে দেয়। ওরা যেহেতু পরিশ্রম করছে ওরা এক হাজার টাকা প্রথমে রেখে ৯ হাজার টাকা পাঠায়। পরে আমি ওখান থেকে তাকে প্রথমে ৫ হাজার পরে আরো দুই হাজার টাকা দেই। আরেক জন বড় ভাই যে বিক্রিতে সাহায্য করছে তাকে দুই হাজার দেই। উনি আবার আমাকে ৫শত টাকা ফিরিয়ে দেয়। পরে আমি তাকে (অভিযোগ করা মেহেদী) জিগাইলাম যে এই টাকা কি করতাম সে বলল তুই তিন দিন পরিশ্রম করেছিস তুই এটা রাখ।
তিনি আরো বলেন, দুই দিন পরে থানা থেকে আমাকে ফোন দিয়েছে। আমাকে বলছে আপনার বন্ধুতো রিকশা বিক্রি করে দিয়েছে। উনারাতো মামলা করতে আসছে। ওই রিকশা চালক নাকি চুরি করে নাই। ওই মালিকরা ক্ষতিপূরণ বাবদ ২০ হাজার টাকা চায়। আমি তখন তাকে বললাম তুই টাকাটা দিয়ে দে। যেহেতু ভুল রিকশা নিয়ে আসছিস তুই টাকা দিয়ে দে। পরে যে তোর ক্ষতি করছে তারে ধরতে পারলে ওই টাকাটা রিকভারি হয়ে যাবে। বাট ও টাকা দিতে রাজি না। ওর সাথে তর্কাতর্কি হয়। ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আজকে হঠাৎ করে সে পোস্ট দেয়। গতকাল রাতেও ওর সাথে আমার কথা হয়।
নাস্তা খরচ ১০ হাজার টাকা চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কোন ভাবেই না। ও আমার কলেজ ফ্রেন্ড। ওর সাথে টাকার কোন আলাপই হয়নি। ওর কাছে নাকি (স্থানীয় ছাত্রদল নেতারা) টাকা চাইছিল। আমি জানি না। আমি তাদের দায়িত্ব দিয়ে চলে আসছিতো। তারা মোট তিন হাজার টাকা তারা নিচে। সাত আটটা ছেলে ৫০০ টাকা করে নিচে। তারা একটা পারিশ্রমিক রাখছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার এসআই মো. আল মামুন দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, থানায় ভুক্তভোগী অলরেডি অভিযোগ দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে, চোর সন্দেহে তারা তাদের রিকশা নিয়েছে। চোর সন্দেহেতো আর কারো রিকশা অন্তত বিক্রিতো করে দিতে পারে না। এটা সমাধানের জন্য তাকে ডাকা হয়েছিল। সে বাদির সাথে বসে সমাধান করবে। দুইতিন দিন বাদীকে ঘুরাইছে। পরে আর সে ওটা সমাধান করতে আগ্রহী ছিল না। যা হয় হবে আমি সমাধানে যাবে না। এ পর্যন্ত সর্বশেষ তার সাথে কথা হয়েছে। বাদিও আর তার পরে এ বিষয় নিয়ে আসেনি। বাদি যদি আসে তাহলে ওসি স্যারের সাথে আলোচনা করে কি করা যায় সে বিষয়ে কথা হবে। তিনি কি ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়েও জানায়নি।