রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ক্ষত এখনও শুকায়নি। দেশজুড়ে চলমান তীব্র ক্ষোভ ও শোকের মধ্যেই এবার চট্টগ্রামে সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে এসেছে। একের পর এক এমন লোমহর্ষক ও পাশবিক ঘটনায় নতুন করে দেশজুড়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে— আমাদের শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ?
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিষ্পাপ এই শিশুরা কারও প্রতিপক্ষ নয়, তাদের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতাও থাকার কথা নয়। তা সত্ত্বেও তারা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে ভয়াবহ সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের।
মে মাসের বিভীষিকা: একের পর এক নৃশংসতার চিত্র
বাকলিয়া (চট্টগ্রাম): বৃহস্পতিবার (২১ মে) চট্টগ্রামের বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় মনির নামের এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পল্লবী (ঢাকা): এর আগে ১৯ মে রাজধানীর পল্লবী সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয় সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে। এই ঘটনায় পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাক গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ): গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার চান্দের চর গ্রামে ১০ বছরের শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় রাজা মিয়া (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রানীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও): গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তার নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর একটি ভুট্টাখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
জালালাবাদ (সিলেট): গত ৬ মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ এলাকায় চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত জাকির হোসেন মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজেই শিশুটিকে খোঁজার নাটক করেন।
এপ্রিল ও মার্চের ভয়াবহতা
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও দেশে একাধিক শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে। গত ২৭ এপ্রিল রাজধানীতে স্ত্রীকে মাদক কেনার টাকা না দেওয়ার জেরে নিজের সন্তানকে গলাটিপে হত্যার অভিযোগ ওঠে শাহিন মিয়া নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একই দিনে গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে আরও পাঁচ শিশুকে হত্যা করা হয়।
এর আগে ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা থেকে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশু ইরাকে। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, ধর্ষণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিবেশী বাবু শেখ শিশুটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা কেটে মৃত ভেবে পাহাড়ের খাদে ফেলে রেখেছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরও ৪৬টি শিশুর ওপর। একই সময়ে ধর্ষণের পর বা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে অন্তত ১৭ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
সংগঠনটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত ৫২২টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১,২২৩টি শিশু; যা গড়ে প্রতি মাসে ৭৬ জনের বেশি।
অপরদিকে এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১,৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী নানামুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত এবং ১,৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। একই সময়ে ৫৮০টি শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮টি শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
সহিংসতা বৃদ্ধির নেপথ্যে কী? বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও কেন এই অপরাধ কমছে না— তা নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা একাধিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ চিহ্নিত করেছেন।
অপরাধ বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মাদকের বিস্তার, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, সাইবার দুনিয়ায় নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাও পরিবারে সহিংসতা বাড়িয়ে তুলছে। বড়দের লোভ, দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিস্বার্থের বলি হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। কখনও প্রতিশোধ নিতে, কখনও অপরাধ আড়াল করতে, আবার কখনও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে আপনজনই শিশুদের ঘাতকে পরিণত হচ্ছেন।
তাদের মতে, সামাজিক অনুশাসনের অভাব, সহনশীলতার সংকট, অনৈতিক সম্পর্ক, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা, নিঃসঙ্গ ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং পারিবারিক অস্থিরতা—এসব কারণ মিলেই বাড়ছে শিশুদের প্রতি সহিংসতা। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অনেক ঘটনায় অভিযোগ দায়ের না হওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ, পারিবারিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বয়স কম হওয়ায় শিশুরা অনেক সময় বুঝতে পারে না কোন আচরণ নিরাপদ আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ। অপরিচিত মানুষের প্রলোভন কিংবা ‘খারাপ স্পর্শ’ সম্পর্কেও তারা বুঝতে পারে না। তাই শিশুদের নিরাপত্তা শেখানো, সতর্ক করা এবং নিয়মিত খোঁজ রাখা, এ দায়িত্ব পরিবারের। বিশেষ করে বাবা-মায়ের।
প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু একের পর এক ঘটনা প্রমাণ করছে, শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এই ধরনের পাশবিক সহিংসতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।” শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নানা সামাজিক দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছে শিশুরা। কঠোর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষা বাড়াতে পারলে এই ধরনের অপরাধ কমানো সম্ভব।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, “আইনের দুর্বল প্রয়োগ বা নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার প্রবণতা অপরাধ বাড়ায়। তবে শক্তিশালী ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থাকলে সুযোগ থাকলেও অনেক মানুষ অপরাধ থেকে বিরত থাকে।” তিনি বলেন, “শিশু নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার পেছনে একক কোনও কারণ নয়, বরং ব্যক্তির মানসিক গঠন, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বেড়ে ওঠা, আসক্তি ও আচরণগত ত্রুটিসহ নানা বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।”
প্রতিরোধের জন্য তিনি কার্যকর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার, সামাজিকভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ শুরু হয় পরিবার ও শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় আচরণগত সমস্যা শনাক্ত করে কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা দিলে ভবিষ্যতের অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, “বড়দের দ্বন্দ্বে শিশুরা প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবাও সন্তান হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। পরিবারের কোনও সদস্য, বিশেষ করে পুরুষ সদস্য মাদকাসক্ত হলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।”
তিনি বলেন, “দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।” পাশাপাশি শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য
পুলিশের দাবি, অপরাধীরা সাধারণত দুর্বল ও অসহায়দের লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং শিশুরা সহজ টার্গেট হওয়ায় তারা শিকার হচ্ছে। আগে মুক্তিপণের জন্য শিশু হত্যা বেশি হলেও এখন ধর্ষণের পর হত্যা এবং পারিবারিক কলহ বা স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের জেরে সন্তান হত্যার ঘটনা বাড়ছে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসেন বলেন, “শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” তিনি বলেন, “সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পুলিশ বিট পুলিশিং, উঠান বৈঠক ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।” পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া সমাজে সহিংসতা কমানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।