Image description

দেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের ‘ঋণনির্ভর ভারসাম্যে’ দাঁড়িয়ে আছে। বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ায় সরকার দেশীয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৬২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা পুরো বছরের বাজেট ঘাটতির ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই নেওয়া হয়েছে ৫২ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ এসেছে মাত্র ১০ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘ডেট বুলেটিন’ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

ডেট বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের অঙ্ক ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি ও বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ায় অর্থনীতিতে কঠিন চাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৭১ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ব্যাংকগুলোতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম। ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি বন্ডে অর্থ রাখতেই বেশি আগ্রহী হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদ ও নিরাপদ বিনিয়োগের কারণে সাধারণ মানুষ আবারও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।
ঋণের আকার বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমদু চৌধুরীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী নোটে বলেছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের ওপর বেশিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়েছে। অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। ফলে সুদ ব্যয় মেটাতে জিডিপির ২ শতাংশের বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে পুঞ্জীভূত ঋণের অঙ্ক ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ কোটি টাকায়।

এ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত মোট ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাতের ঋণের পাহাড় ৮ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া ৪ লাখ ১৯ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা।

ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ সম্প্রতি তৈরি করা এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলেছে, দেশি ও বিদেশি ঋণ নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা আগামীতে আরও বাড়তে পারে। কারণ, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে উচ্চ সুদে ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় মারাত্মকভাবে বাড়ছে। কম রাজস্ব আহরণ ও ঋণ পরিশোধে বাড়তি ব্যয়ের কারণে আগামীতে দেশি-বিদেশি ঋণ বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। এই সংকট মোকাবিলায় রাজস্ব বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার না আনলে অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, জিডিপির অনুপাতে এ ঋণের হার বিশ্লেষণ করলে তা এখনো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ঋণ মোকাবিলায় নতুন সরকারের আয় বাড়ানো বিরাট চ্যালেঞ্জ হবে। কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সরকার ঋণ না নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় না মেটালে অর্থনীতি সম্প্রসারণ হবে না। প্রয়োজনে ঋণ নিতে হবে, তা পরিশোধ করতে নিয়মিত আয় থাকতে হবে। সে আয় হচ্ছে রাজস্ব বৃদ্ধি।
এদিকে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়েছে অর্থ বিভাগ। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাবে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

ইআরডির সূত্রমতে, বর্তমান মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশই নেওয়া হয়েছে মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ ঋণের বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারে সঞ্চিত আছে। এ ছাড়া ঋণের ২২ শতাংশ হচ্ছে জাপানিজ মুদ্রা ইয়েনে নেওয়া, চীনের ইউয়ানে আছে ৭ শতাংশ এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য মুদ্রায়।