রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব কর্মসূচি থেকে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতারা বলেন, এই ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়কে সামনে তুলে এনেছে। ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো নৃশংস ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রাখছে।
এদিকে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গতকাল রাতে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। আশা করি, সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
একই দিন সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, শিশুহত্যার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে যা কিছু করা সম্ভব, সরকার সবটুকু করবে। এ ঘটনায় আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর ক্যাম্পাসের ফটকে ‘অভিভাবক ও শিক্ষার্থী নেটওয়ার্ক’-এর ব্যানারে এ ঘটনার বিচার চেয়ে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এতে বক্তব্য দেন অভিভাবক মুসলিম বিন হাই, শিশু-কিশোর মেলার সংগঠক পংকজনাথ সূর্য, ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাইনা প্রমুখ।
পল্লবীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। রাজধানীর শাহবাগে একদল বিক্ষোভকারী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
সংগীত সমাবেশ
‘শিশুদের বাঁচতে দাও’, ‘শিশু নিপীড়ন বন্ধ করো’, ‘তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’– প্ল্যাকার্ডের এই বাক্যগুলো রাজধানীর নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের খুদে শিক্ষার্থীদের লেখা। বিকেলে এক ব্যতিক্রমী সংগীত সমাবেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা অংশ নেন। শুধু পল্লবীর শিশু নয়, সব শিশুহত্যা ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগীত পরিবেশন করে তারা। সমাবেশ থেকে শিশু নির্যাতন বন্ধ, আইনের শাসন নিশ্চিত এবং শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।
শিশুকন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন শোবিজ তারকারাও। সামাজিক মাধ্যমে ধর্ষকের বিচার দাবি করছেন তারাও।
শোবিজ তারকাদের ক্ষোভ
শিশুকন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন শোবিজ তারকারাও। সামাজিক মাধ্যমে ধর্ষকের বিচার দাবি করছেন তারাও। মেগাস্টার শাকিব খান ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, ‘এই বেদনা আমাদের সবার! এই নৃশংস ঘটনা পুরো সমাজের মানবিকতা, নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়!’
বিবৃতিতে বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদ
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, গত সাত দিনে চার কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহ জোগাবে।
বিবৃতিদাতারা হচ্ছেন– সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, খুশী কবির, নূর মোহাম্মদ তালুকদার ও অধ্যাপক এম এম আকাশ।
নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক ৭১ সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির বিবৃতিতে সব নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
৯টি বাম ও প্রগতিশীল দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এসব নৃশংস ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানানো হয়।
সমতা, ন্যায়বিচার ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সংগঠনগুলোর জোট ‘কোয়ালিশন ফর অ্যাডভান্সিং ইকুয়ালিটি অ্যান্ড জাস্টিস’-এর বিবৃতিতে এ ঘটনায় ন্যায়বিচার এবং শিশু সুরক্ষা জোরদারে জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বিবৃতিতে বলেন, নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
এ ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে আরও বিবৃতি দিয়েছে ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট, জাতীয় নারী নির্যাতনবিরোধী ফোরাম, শ্রমজীবী নারী মৈত্রী ও হকার্স ইউনিয়ন।
শিশুহত্যায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের ক্ষোভ
পল্লবীতে শিশুহত্যাসহ দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম। একই সঙ্গে এসব ঘটনার নিঁখুত ও জবাবদিহিমূলক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল ফোরামের সভাপতি মমতাজ আরা বেগমের সই করা বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
জেলায় জেলায় বিক্ষোভ
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলা মোড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধন করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা শাখা এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
শেরপুরে শহরের খরমপুর মোড়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আজকের তারুণ্য মানববন্ধন করে। এতে অংশ নেন নিহত শিশুর চাচা। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে তাঁকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেও তিনি কিছু বলতে পারেননি। শুধু অঝোরে কেঁদেছেন।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রীন ভয়েস’ ও ‘বহ্নিশিখা’ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে সমাবেশ বক্তারা সব ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানান।
লক্ষ্মীপুর শহরের ঝুমুর চত্বরে ধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চ ও সর্বজনীন সচেতন নাগরিকের ব্যানারে মানববন্ধন হয়। সাতক্ষীরার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেলার সব সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের সড়কে মানববন্ধন করা হয়।