Image description

ইসলামি শরিয়তে ‘তাকবিরে তাশরিক’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ওয়াজিব আমল। পবিত্র জিলহজ মাসের ৯ তারিখের ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত দিনগুলোকে ‘তাশরিকের দিন’ বলা হয়ে থাকে। এই বিশেষ দিনগুলোতে মহান আল্লাহর মহত্ব, বড়ত্ব ও একক সত্ত্বার ঘোষণা দিয়ে এবং আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে মুসল্লিরা যে তাকবির পাঠ করেন, পরিভাষায় তাকেই ‘তাকবিরে তাশরিক’ বলা হয়। এই দিনগুলোতে প্রত্যেক মুসল্লির জন্য ফরজ নামাজের পর আল্লাহর প্রশংসায় তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করা আবশ্যক। মূলত, ‘আল্লাহু আকবার’ মহান আল্লাহর প্রিয় বাক্যগুলোর একটি; তাই আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করতে এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাকবির পাঠ করা উচিত।

তাকবিরে তাশরিকের আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ

আরবি: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ وَاَللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

বাংলা অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান; আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য বা ইলাহ নেই; আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান; সব প্রশংসা কেবল মহান আল্লাহর জন্য।

কবে থেকে এবং কতদিন পড়তে হবে?
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য জিলহজ মাসের ৯ তারিখের ফজর নামাজ হতে শুরু করে ১৩ তারিখের আসর নামাজ পর্যন্ত—মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায়ের পর সালাম ফিরানোর সাথে সাথেই উচ্চস্বরে একবার এই তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা ওয়াজিব। সেই হিসেবে চলতি বছরে আগামী বুধবার (২৭ মে) ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে রবিবার (৩১ মে) আসর নামাজ পর্যন্ত এই তাকবির পাঠ করতে হবে। (উৎস: আদ্দুররুল মুখতার: ৩/১৭৭-১৭৮)

তাকবিরে তাশরিক সংক্রান্ত জরুরি ৬টি মাসায়েল

১. নারীদের বিধান: পুরুষেরা ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে এই তাকবির পাঠ করলেও, নারী বা মহিলা মুসল্লিরা সম্পূর্ণ নিচু স্বরে (মনে মনে বা ফিসফিস করে) এই তাকবিরে তাশরিক আদায় করবেন; কোনোভাবেই উচ্চস্বরে নয়। (উৎস: হাশিয়া তাহতাবী ১/৩৫৭)

২. ইমাম ভুলে গেলে করণীয়: জামায়াতে নামাজ আদায়ের পর ইমাম সাহেব যদি কোনো কারণে এই তাকবির বলতে ভুলে যান, তবে মুক্তাদিরা ইমামের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই তৎক্ষণাৎ তাকবির পাঠ করে নেবেন। (উৎস: ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫২)

৩. পাঠ করার সঠিক সময়: প্রত্যেক ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর পরই, কোনো ধরনের কথাবার্তা কিংবা নামাজের পরিপন্থী অন্য কোনো কাজ (যেমন: স্থান পরিবর্তন বা ক্বিবলা থেকে ঘুরে যাওয়া) করার আগেই তাকবিরে তাশরিক পড়তে হবে। (উৎস: রদ্দুল মুহতার ২/১৮০)

৪. ভুলে গেলে কাজার বিধান: ফরজ নামাজের পর কেউ বা সবাই যদি ভুলবশত তাকবির বলতে ভুলে যান, তবে মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই মনে পড়লে তা আদায় করে নিতে হবে। কিন্তু যদি কেউ মসজিদ থেকে বের হয়ে যান, তবে এই ওয়াজিবটি চিরতরে ছুটে যাবে। উল্লেখ্য, এই ওয়াজিবের কোনো কাজা নেই এবং ওয়াজিবটি ইচ্ছাকৃত বা অবহেলা করে ছেড়ে দেওয়ার কারণে ওই ব্যক্তি গুনাহগার হবেন। (উৎস: মাবসুত সারাখসী ২/৪৫)

৫. কাজা নামাজের হুকুম: এই তাশরিকের দিনগুলোর (৯ থেকে ১৩ জিলহজ) কোনো ফরজ নামাজ যদি এই দিনগুলোর মধ্যেই কাজা হয়ে যায় এবং এই দিনগুলোর ভেতরেই তা কাজা আদায় করা হয়, তবে তাকবির বলা ওয়াজিব। কিন্তু তাশরিকের দিনগুলোর কোনো কাজা নামাজ যদি জিলহজের ১৩ তারিখের পর অন্য কোনো সাধারণ সময়ে আদায় করা হয়, তবে তাকবির বলা ওয়াজিব নয়। একই সাথে, ৯ জিলহজের আগের (ধরা যাক ৮ জিলহজের বা তার আগের) কোনো কাজা নামাজ যদি এই তাশরিকের দিনগুলোতে আদায় করা হয়, তাহলেও তাকবির বলা ওয়াজিব হবে না। (উৎস: বাদায়েউস সানায়ে ১/৪৬৪)

৬. মাসবুকের (যার রাকাত ছুটে গেছে) বিধান: কোনো ব্যক্তি যদি জামায়াতে নামাজ আদায় করার সময় প্রথম দিকে এক বা একাধিক রাকাত হারিয়ে ফেলেন (যাকে মাসবুক বলা হয়), তবে তিনি ইমাম সাহেবের সাথে সালাম ফেরাবেন না। ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর ওই ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নিজের অবশিষ্ট নামাজ পূর্ণ করবেন এবং নিজের নামাজের শেষ সালাম ফেরানোর পর এই তাকবিরে তাশরিক পাঠ করবেন। (উৎস: ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫২)