গাজীপুর থেকে ছুটে আসা ‘গাজীপুর পরিবহনের একটি বাস মহাখালীর আমতলী মোড়ের সিগনাল পার হয়ে আটকে গেল। চালক সালাম বললেন, টার্মিনাল পার হতে অন্তত আধাঘণ্টা লাগবে।
সোমবার বিকালে সালামের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন তার চোখমুখে বিরক্তির ছাপ দেখা গেল। জানালেন, এখানে অন্তত আধাঘণ্টা যাওয়া ‘নিত্যদিনের ঘটনা’।
মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের সড়কের দুই পাশেই সারি সারি করে রাখা হয় বাস। দিনের পর দিন এভাবে সড়ক দখল করে রাখার ফলে যানজট ছাড়ে না মহাখালীতে। তাছাড়া সড়কে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলায় পরিস্থিতি সবসময়ই প্রকট আকারে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে সড়কটিতে এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে টার্মিনালটি সরানোর পরিকল্পনাও চলছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলছেন, “রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে আমরা মনে করি দ্রুত সময়ের মধ্যে আরো এআই ক্যামেরা বসাতে হবে। এর মধ্যে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মহাখালী বাস টার্মিনাল।
“এই মহাখালী বাস টার্মিনাল আসলে আমরা কন্ট্রোল করতে পারছি না। এটা আমাদের জন্য খুব সমস্যা। জটিল একটা সমস্যা দাঁড়িয়েছে।”
ইতোমধ্যে রাজধানীর ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ক্যামেরাগুলোতে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ লঙ্ঘন শনাক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
আইন লঙ্ঘন করা গাড়ির নম্বর শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক এ ক্যামেরাগুলোকে ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ বলছে পুলিশ। এটি ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ প্রযুক্তির উন্নত নিরাপত্তা ক্যামেরা, যা দূরবর্তী স্থান থেকে ডানে-বামে, উপরে-নিচে ঘোরানো ও জুম করা যায়।
এসব ক্যামেরা আইনের ছয় ধরনের বিধান অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত করে নম্বরপ্লেটসহ গাড়ির ছবি তুলে রাখছে। সেসব ছবি-ভিডিও ডিএমপি সদর দপ্তরের ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে জমা করছে।
এ সফটওয়্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভারও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সহজেই আইন ভঙ্গকারী যানবাহনের নম্বর দিয়ে নিমিষেই মিলছে গাড়ির মালিকের বিস্তারিত তথ্য।
টিটিইউ টিমের সদস্যরা সার্ভারের ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করে আইন অমান্য করা গাড়ির মালিকের নামে মামলা দিচ্ছেন। ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের’ মাধ্যমে মালিক/চালকদের রেজিস্টার্ড ঠিকানায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেসব মামলার কপি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মহাখালী টার্মিনাল পার হয়ে উত্তরার দিকে যেতে খুব একটা সমস্যা হয় না মন্তব্য করে পুলিশ কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, “কিন্তু মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে এসে নানান ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়। এই অনিশ্চয়তা দূর করা কঠিন কাজ নয়; কিছু সদিচ্ছা দরকার।
“ওখানে অনেক সমস্যা। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি গাড়ি আছে, নানান কাহিনী আছে; তার পরেও এটার সমাধান সম্ভব। এজন্য ওখানে এআই ক্যামেরা বসছে।”
এরই মধ্যে টার্মিনাল ঘিরে এআই বসানোর কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রোববারের মধ্যে তা চালু হতে পারে।
আলাপচারিতায় অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, এই টার্মিনালের সামনে এবং উত্তর দিকে বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে, যেখান থেকে তেল সংগ্রহ করে থাকে বাসগুলো। তেল সংগ্রহ করার সময় দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়, তাতে সড়কের একটি লেইন কমে আসে। এতে করেও যানজট বেড়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা আনিছুর বলেন, “তেল নেওয়ার জন্য আলাদা লাইন চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে রাস্তার ধারে বাস বা কোন গাড়ি দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এআইয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করে মামলা দেওয়া হবে।
“আমরা মনে করি, এটাতে বড় একটা সুফল পাওয়া যাবে।”
ব্যর্থ আগের সব উদ্যোগ
আশির দশকে নির্মিত মহাখালী বাস টার্মিনাল সময়ের পরিক্রমায় যানজটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। টার্মিনাল ঘিরে অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ পথে চলাচলকারীদের পিছু ছাড়েনি ভোগান্তি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে টার্মিনালটির ভেতর থেকে যাত্রী উঠিয়ে গেইটলক করে বাস ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে রেইলগেইট, আমতলী, চেয়ারম্যান বাড়ি, সৈনিক ক্লাব ও কাকলী বাস স্টপেজ পর্যন্ত দূরপাল্লার বাসগুলোকে গেইটলক রাখতে হবে। মাঝপথে কোনো বাস যাত্রী উঠাতে পারবে না।
কয়েকদিন এই নিয়ম মানার পর ফিরে আসে আগের চিত্রই।
এই উদ্যোগ সফল না হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে মন্তব্য করে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দূরপাল্লার যাত্রীরা টার্মিনাল পর্যন্ত যেতে চান না, তারা সড়কের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে ভাড়া নিয়ে কন্ডাকটারের সঙ্গে দরকষাকষি করে থাকেন। তাছাড়া টার্মিনালে যাত্রী কম হওয়ায় গেইট লকের নিয়ম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি এও বলেন, “লোকাল বাসগুলোর যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ।”
বছর পাঁচেক আগে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ১০টি ইউটার্ন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এর মধ্যে মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে, তেজগাঁও নাবিস্কো মোড় এবং সাতরাস্তার বিজি প্রেস এলাকায় নির্মিত তিনটি ইউটার্ন রয়েছে।
ওই সময়ে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশন তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই তা নির্মাণ করে এবং তাতে যানজট ভিন্ন রূপ নেয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ইউটার্ন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে নাবিস্কো মোড়ের কাছে একটি ইউটার্ন চালু আছে। টার্মিনাল থেকে বের হওয়া গাড়ির রাইট ইউটার্ন নেওয়ার জায়গা আছে। আবার টার্মিনালের সামনে একটি ইউটার্ন রয়েছে। সেই সঙ্গে সড়কের দুই পাশেই সারি সারি করে রাখা হয় বাস। ফলে ওই এলাকায় যানবাহনের জটলা লেগেই করে।
সড়কের পাশে বাস দাঁড় না করানোর বিষয়ে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা মানা হয় না।
তবে গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উপ কমিশনার মোহাম্মদ মাসুদ রানার ভাষ্য, এখন আর কোন বাস রাস্তায় দাঁড়ানো থাকে না। সেখানে এজন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
“তবে ওই এলাকায় একাধিক তেলের পাম্প রয়েছে; যেসব বাস দাঁড়ানো থাকে, তারা মূলত তেল নেওয়ার জন্য লাইনে থাকে।”
টার্মিনালে বহুতল ভবন নাকি স্থানান্তর?
সড়ক ও জনপথ থেকে ৯ দশমিক ৪৪ একর জায়গা নিয়ে গড়া এই টার্মিনাল ২০২৩ সালের দিকে পূর্বে বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৫ একরে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক (মহাখালী বাস টার্মিনাল) মো. মেহেদী হাসান বলেন, ১৯৮৪ সালে সিটি করপোরেশনের অধীনে টার্মিনালটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঢাকা-ময়মনসিংহসহ টাঙ্গাইলের পথে চলাচলের জন্য মূলত এই টার্মিনালটি করা হয় জানিয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মহাখালী শাখার সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, গাজীপুর, টঙ্গী, শ্রীপুর ও ভালুকা হয়ে ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল যাওয়ার জন্যই এই টার্মিনালটি গঠন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এই টার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস চলাচল করে থাকে।
উত্তরবঙ্গে জন্য গাবতলী টার্মিনাল এবং দক্ষিণ-পূর্ব জেলার যাত্রীদের জন্য সায়েদাবাদ টার্মিনাল থাকলেও ওই সব পথের অনেক গাড়িই মহাখালী থেকে ছাড়ে বলে ভাষ্য আজাদের।
তিনি মনে করেন, বর্তমানে মহাখালী থেকে যাত্রীরা খুব অল্প সময়ে টঙ্গী হয়ে সিলেট যেতে পারে। তাছাড়া যমুনা সেতু হওয়ার কারণে উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের একটি অংশ আশুলিয়া বা গাজীপুরের টঙ্গী হয়ে যাতায়াত করেন। তাতে তাদের সময় সাশ্রয় হয়।
সড়ক পরিবহন সমিতির নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মহাখালী টার্মিনাল থেকে দেশের প্রায় সব রুটে বাস চলাচল করার কারণে সীমিত এই জায়গার মধ্যে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বাস টার্মিনালটি উল্টো দিকে করার কারণে টার্মিনাল থেকে বাস বের হয়ে টার্ন নিতে বেশ সময় যায়। এসব কারণেই টার্মিনাল এলাকায় যানজট লেগে থাকে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে টার্মিনাল স্থানান্তরের কোনো বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এটা এখন সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা অপারেটর মাত্র।”
ডিএনসিসির পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, এই টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে তিনশ বাস হলেও বর্তমানে ১২ শতাধিক বাস চলাচল করছে।
২০২৩ সালের শেষে দিকে টার্মিনালের জায়গা ১ একরের বাড়লেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।
মেহেদী বলেন, কিছু বাস আছে টার্মিনালে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, ফলে অন্য বাসগুলোর জায়গা না হওয়ায় রাস্তায় রাখতে বাধ্য হয়। এ কারণে ৮ ঘণ্টা বা সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে যার ট্রিপ আছে, সেই বাসটি কেবল টার্মিনালে রাখার সিদ্ধান্ত হলেও সেটি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
“বর্তমানে টার্মিনালের ভেতরে দোতলা যে অবকাঠামো আছে (টিকেট কাউন্টার, যাত্রীদের বসার জায়গা, মালিক- শ্রমিকদের অফিস) সেটা ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করে টার্মিনালের জায়গা বড় করার ব্যাপারে আলোচনা আছে।”
তবে টার্মিনাল স্থানান্তর করার ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “পূর্বাচল এবং মেট্রোরেল উত্তরা উত্তর স্টেশনের কাছে দিয়াবাড়ী-ভাটুলিয়ায় একটি জায়গার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ ভাবছে। বাস ছাড়াও তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডটিও সরানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে কোনোটিই চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি।”