কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরুর হাটগুলোতে যেমন জমজমাট বেচাকেনা চলছে, তেমনি ব্যস্ত সময় পার করছে রংপুরের একটি অভিনব ‘আবাসিক হোটেল’। তবে এই হোটেলের অতিথিরা মানুষ নন, বরং দক্ষিণবঙ্গে পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা শত শত গরু।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বারো আউলিয়া এলাকায় আশানুর ইসলামের এই গরুর হোটেলে বর্তমানে সাড়ে তিন শতাধিক গরু অবস্থান করছে। মাত্র ৬০ টাকা ভাড়ায় নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের ভরসা এখন এই হোটেল।
শুধু রাখা নয়, মিলছে সেবাও
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে ৫০ শতক জমিতে তৈরি টিনের শেড ভেতর থেকে বেশ পরিপাটি। সারিবদ্ধভাবে বাঁধা গরুর মাথার ওপর ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। টিনের চালায় বিশেষ ব্যবস্থায় সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। এক পাশে কর্মচারীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন খড় ও ভুসি খাওয়াতে।
হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায়, এখানে শুধু গরু রাখার জায়গা নয়; আছে বিশুদ্ধ পানি, পরিচর্যা ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা। বড় ও উন্নত জাতের গরুদের জন্য রয়েছে বিশেষ কক্ষ, যেখানে দেওয়া হয় বাড়তি যত্ন।
ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটল
দূরপাল্লার ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় ভোগান্তি ছিল গরু কেনার পর তা নিরাপদে রাখা ও পরিবহণের ব্যবস্থা করা। আগে গরু কিনে ঝড়-বৃষ্টি বা রোদে রেখে দিতে হতো। এতে পশুগুলো অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়তো। এখন সেই দুশ্চিন্তা নেই।
লক্ষীপুরের গরু ব্যবসায়ী আদনান মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে এখানে জড়ো করছি। একসঙ্গে ট্রাকে ভরে নিয়ে যাচ্ছি। আগে গরু ক্লান্ত হয়ে যেত, এখন হোটেলে থাকায় গরু তাজা থাকে।’
ফরিদপুরের আরেক গরু ব্যবসায়ী মমিন সরকার সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এক ট্রাকে ৩০-৪০টি গরু যায়। এক সপ্তাহ লেগে যায় কেনায়। এই হোটেলের সুবাদে কেনার পর পরই গাড়ি চার্জ না করেও নিরাপদে রাখতে পারছি।’
স্বপ্ন থেকে বাস্তব
আশানুর ইসলামের এই উদ্যোগ পুরনো অভিজ্ঞতা থেকেই। তিনি শৈশবে বাবার সঙ্গে হাটে গিয়ে দেখেছেন, গরু কেনার পর রাখার জায়গা থাকে না। হঠাৎ করে গরু মারা যাওয়ার ঘটনাও দেখেছেন। সেই চিন্তা থেকেই ১০ বছর আগে বাবার পরামর্শে গরুর আবাসিক হোটেল খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে শুধু আশানুর নন, তার ছোট ভাই শাহিন মিয়া ও ভগ্নিপতি আলাল মিয়াও হোটেলের দেখাশোনা করছেন। এখানে ৪০০-৫০০ গরু রাখার ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সক্ষমতার চেয়েও বেশি চাপ রয়েছে।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বারো আউলিয়া এলাকায় গড়ে উঠেছে ‘গরুর আবাসিক’ হোটেল। ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক চাকা সচল
এই হোটেল ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে গোখাদ্যের দোকান। খড় ও ভুসি বিক্রি করে স্থানীয় ২০ জনের মতো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। হোটেলে কাজ করছেন ১৫ জন কর্মচারী।
এক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে জানান, কখনো কখনো গরু কিনতে তাৎক্ষণিক টাকার প্রয়োজন হলে আশানুর ইসলাম নিজেও ব্যবসায়ীদের ধার দেন। এই উদ্যোগ গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।
প্রশংসা কর্তৃপক্ষের
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘গরুর আবাসিক হোটেল নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন উৎফুল্ল, তেমনি গরুগুলো কম ক্লান্ত হচ্ছে। এটি অন্যত্রও বিস্তার লাভ করুক।’
অন্যান্য হোটেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নেই
শুধু রংপুরের বারো আউলিয়া নয়; রংপুরের দমদমা সেতু এলাকায় মোবারক আলী ভুট্টোর আরেকটি গরুর হোটেলও সাড়া ফেলেছে। এখানেও তিন শতাধিক গরু থাকার ব্যবস্থা রয়েছে এবং চিকিৎসাসহ সবধরনের সেবা দেওয়া হয়।
তবে জানা যায়, টাঙ্গাইলের গোবিন্দাসী হাটকে কেন্দ্র করে শতাধিক ছোট-বড় গরুর হোটেল থাকলেও, রংপুরে এই ধারণা অপেক্ষাকৃত নতুন। বিশেষ করে কোরবানির সময় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়ায় রংপুরের এসব হোটেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
রংপুরের এ অভিনব উদ্যোগ এখন শুধু গরুর আশ্রয়স্থল নয়, বরং দুর্গম পথে পাড়ি দেওয়ার আগে গরুর ‘ট্রানজিট হোম’ হিসেবে কাজ করছে, যা ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।