Image description

দেশে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৮৮। ২০২৬ সালে বিশ্বে এটি হামে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।

 

এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৮৩ শিশুর এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরো ৪০৫ জন। একই সময়কালে হাম ও উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সুদানে। সেখানে মারা গেছে ৩৭১ জন। অথচ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যায় বাংলাদেশের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে ছিল সুদান।

সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুতে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে হামে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মেক্সিকোতে ৩২ জন, ইয়েমেনে ২৫, অ্যাঙ্গোলায় ১৫ এবং গুয়াতেমালায় ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। মৃত্যুর এ সংখ্যা হামে আক্রান্ত ও উপসর্গে মারা যাওয়াদের। আর সব দেশেই মূলত শিশুরা মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হালনাগাদ তথ্যের অভাব দেখা গেছে।

 

২০২৬ সালে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে হামের এ নতুন প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতেও হাম ফিরে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যার আধিক্যের কারণে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে।

 

চলতি মাসে সংস্থাটি ‘মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা গ্লোবাল সিচুয়েশন আপডেট’ নামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে হাম রোগীর সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। আলোচ্য ছয় মাসে বাংলাদেশে হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৭৬। শীর্ষ নয় দেশের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ছিল ভারত (১৯ হাজার ৭০৫), ইয়েমেন (১১ হাজার ৩৫৪), মেক্সিকো (১০ হাজার ৬৭৮), পাকিস্তান (৯ হাজার ৬৭১), অ্যাঙ্গোলা (৬ হাজার ৯৫৮), কাজাখস্তান (৬ হাজার ৮৫৬), ক্যামেরুন (৬ হাজার ৮৫১), সুদান (৪ হাজার ৮৮০), গুয়াতেমালা (৪ হাজার ৮০২)।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। পরীক্ষাগারে একদিকে নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে উপসর্গ নিয়ে ভুগছে অনেক শিশু। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।

আক্রান্তের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দেশে হামে এ মৃত্যুহার এখন দশমিক ৯৮ শতাংশ। মৃত্যুহার বেশি হওয়ার কারণের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, দীর্ঘদিন এমআর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা, শিশুদের অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামের জটিলতায় দ্রুত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আবার কোথাও মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও জটিলতা ও মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ এখন হাম সংক্রমণে বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য টিকা কিনতে সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ডা. নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাম প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হলো টিকাদানে বড় ঘাটতি, দীর্ঘদিন হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন না হওয়া, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি অপুষ্টি ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর পদ খালি। শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য রুটিন টিকাদান জোরদার করা জরুরি।’

সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে হামে তিনজন এবং হামের উপসর্গে চারজন মারা গেছে। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০৮ জনের এবং উপসর্গের রোগী ছিল ১ হাজার ৪২৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭৯ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১ হাজার ২১৬ জন।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২০৯ জনের (নিশ্চিত হামে ৪৯ জন)। শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯৫ জন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। এ পর্যন্ত সেখানে ১৭ জন মারা গেছে। এছাড়া বিভাগটিতে উপসর্গে মারা গেছে ২৯ জন। শনাক্ত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ২২৪।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘হাম ও এর উপসর্গে মূলত নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং পানিশূন্যতাসহ মস্তিষ্কের প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুরা বেশি মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর হার বাড়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে টিকাদানের ঘাটতি বা বিলম্ব। নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে পিছিয়ে থাকা বা টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়ার ফলে শিশুদের মাঝে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।’

চট্টগ্রাম বিভাগে এ পর্যন্ত ১০ জন শিশু হামে মারা গেছে এবং উপসর্গ নিয়ে ৩৯ জন। এছাড়া বিভাগটিতে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৯ হাজার ৬৩২ জনে এবং শনাক্ত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ৬২৮।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ব্লকে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছেন শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. ফারহানা জেরিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে শরীরে অন্য সংক্রমণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হামের পর অনেক শিশুর ভাইরাল নিউমোনিয়ার পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়াও দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করত, এখন সেগুলো করছে না। আবার হাম যেহেতু একটি ভাইরাল রোগ, তাই এর বিরুদ্ধে সরাসরি কার্যকর কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও নেই। ফলে শিশুর শরীরে একাধিক জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। যার কারণে হামে আক্রান্ত, উপসর্গ আছে কিংবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।’

বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার শিশুরা হামে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ। বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অপুষ্টি। যেসব শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হামের জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। দরিদ্র পরিবারের ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর হচ্ছে।’

শুধু জটিলতা দেখা দিলেই কেবল আক্রান্তকে হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয় জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণে রোগীকে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসছেন, এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরো বাড়ছে।’

হাম মোকাবেলায় তারা কী পরিকল্পনা করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নেও জোর দিতে হবে। বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেয়া হচ্ছে।’ হাম মোকাবেলায় টিকাদান কার্যক্রম আরো জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

দেশে হামের সংকটে অনেকগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে বিগত সময়ে টিকাদান কর্মসূচি নানাভাবে ব্যাহত হওয়ায় সমস্যা আরো বেড়েছে। টিকাদান কর্মসূচির যে চিত্র সংবাদমাধ্যম কিংবা নথিতে মেলে মাঠপর্যায়ে তার চেয়ে অনেক কম ছিল। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তো টিকাদান কর্মসূচিই করা যায়নি। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকার দূরদর্শীভাবে বিষয়টি সামাল দিতে পারেনি। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি নানা কারণে ক্যাম্পেইনটি চালানো যায়নি। ওই সময় টিকা দেয়া হলে আজ এমন সংকটের মুখে পড়তে হতো না।’

হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘১৬ মার্চ হামে আক্রান্ত হয়ে প্রথম শিশুর মৃত্যুর পর থেকেই টিকাদানের কাজ শুরু হয়। প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বা তার একটু বেশি বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া গেছে। এটিকে স্বাস্থ্য খাতের সফলতা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এমনকি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০ এপ্রিল যে শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে ২০ মে। এ মধ্যবর্তী সময়ে অর্থাৎ চার-পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিদিন ১১০০-১২০০ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এমনটিই অন্তত দেখা যাচ্ছে। তবে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করবে। আগামী ২০ জুন পর্যন্ত আমরা তার হার দেখতে পাব। এর পরবর্তী সময়ে আমরা হাম নিয়ন্ত্রণের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব এমন সম্ভাবনা আছে।’