Image description

র‌্যাব-৪-এর সিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া ডিআইজি মোজাম্মেল হক। তিনি এর আগে বগুড়া ও নওগাঁর এসপির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে ওই এলাকায় ব্যাপক দমন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। এতে বিরোধী দলের একাধিক নেতাকর্মীকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে। অনেককে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া, আবার কাউকে মামলায় ফাঁসিয়ে জমি ও ভিটেছাড়া করা হয়েছে। ডিআইজি মোজাম্মেল ছিলেন ওইসব অপকর্মের মূল হোতা। এর পুরস্কার হিসেবে তাকে এসপি থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি এবং পরে ডিআইজিতে পদোন্নতি দিয়েছিল আওয়ামী সরকার।

জুলাই বিপ্লবের পর তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। ড. ইউনূস সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আওয়ামী আমলের বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একই পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।

এরই অংশ হিসেবে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ডিআইজি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন ডিআইজি এবং দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরো ৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও দপ্তরে দায়িত্বরত ও সংযুক্ত ছিলেন।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো নিয়ে পুলিশে আলোচনা চলছে; আর কোনো কোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। জানা যায়, যেসব পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা এখন আতঙ্কে আছেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ের আরো ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে। এর মধ্যে ১৩ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩১ জন এসপি এবং ৯ জন এএসপি রয়েছেন। এসব এসপির মধ্যে আওয়ামী সরকারের ডামি ও রাতের ভোটে দায়িত্ব পালন করেন অনেকে। এছাড়া বিগত সময়ে এইসব পুলিশ কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল। তারা বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত আছেন।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর দিয়ে থাকে সরকার। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যে কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার ওই কর্মচারীকে ‘জনস্বার্থে’ যেকোনো সময় অবসরে পাঠাতে পারে। এ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিরিক্ত আইজিপি আমার দেশকে জানান, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী গত দেড় বছরে কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। আরো একাধিক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বিষয়টি জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা আমার দেশকে জানান, বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন হলে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে। যাচাই-বাছাই করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগার হয়ে অপকর্ম করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুলিশের মধ্যে দলীয়করণ করলে পুরো বাহিনীর বদনাম হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী সরকারের সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনে অতিউৎসাহী ছিলেন। তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অযাচিত দমনপীড়ন চালিয়েছেন। এদের কিছু কর্মকর্তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পদায়ন হওয়ায় খোদ পুলিশের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

সূত্র জানায়, মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা আছে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন । ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে।

দুটি হত্যা মামলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মিজান। এ ঘটনায় নিহত যুবদল নেতার বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি মাহবুব আলম খান।

এছাড়া ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরো একজন ভুক্তভোগী বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় অপর হত্যা মামলাটি করেন। মাহবুব ওই মামলায় ৩ নম্বর আসামি।

জানা গেছে, ২০২২ সালের ৩১ জুলাই বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূরে আলম। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৪ আগস্ট ভোলা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আরমান হোসেনসহ ৩৬ পুলিশ সদস্যের নামে হত্যা মামলা হয়। সেই আরমানকে সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসেবে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে আর সেখানে পদায়ন করা হয়নি।

সূত্র জানায়, বিতর্কিত এসব কর্মকর্তার পদায়নে পুলিশ প্রশাসনে ঝড় ওঠে। এসব কর্মকর্তা যাতে আবার বাহিনীটির গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন না পান, এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো প্রায় ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাবে বলে জানা গেছে। পুলিশের ১১৪ কর্মকর্তা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বর্তমানে সংযুক্ত আছেন। এদের বড় অংশকেই অবসরে পাঠানোর চিন্তা রয়েছে সরকারের।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার পুলিশে পেশাদার ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ পেশাদার কর্মকর্তা আগে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকের আওয়ামী আমলে পদোন্নতি না পেয়ে মনোবল ভেঙে গেছে। প্রায় সোয়া দুই মাস আগে ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাত আলী পদত্যাগ করার পর মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। আস্থাভাজন পুলিশ কর্মকর্তা সংকটের কারণে এ বিলম্ব হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, এ সংকট শিগগির কেটে যাবে।