Image description

আসন্ন কোরবানি ঈদকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় এসে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গরু কোরবানি সম্পর্কিত ১৯৪৯ সালের আইন কঠোরভাবে মানার নির্দেশ দিয়েছে।

ফলে ঈদে পশু কোরবানি করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাজ্য সরকারের নির্দেশিকার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা করা হয়েছে। টানা দুদিন এ বিষয়ে দীর্ঘ শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। তবে আপাতত রায় প্রদান স্থগিত রেখেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) পর্যন্ত ১১টি জনস্বার্থ মামলা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। এর মধ্যে একটি মামলা দায়ের করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আখরুজ্জামান।

আগের দিন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, একই বিষয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। তাছাড়া মামলাটি জরুরি ভিত্তিতে শুনানি হলেও রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে আবেদনপত্রের কোনো অনুলিপি (কপি) পাঠানো হয়নি। ফলে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ শুনানি স্থগিত ঘোষণা করেন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টিকে তালিকার প্রথম মামলা হিসেবে প্রধান বিচারপতি ডিভিশন বেঞ্চ শুনানি শুরু করেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চলে শুনানি। এরপর আদালতের পর্যবেক্ষণ জানা গেলেও পূর্ণাঙ্গ রায় দান স্থগিত রাখে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।

সম্প্রতি বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন অনুযায়ী কিছু নিয়ম বলবৎ করেছে রাজ্যে। এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। ১৪ বছর বয়স হয়নি এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। মাংস কাটার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পশ্চিমবঙ্গ প্রাণিসম্পদ দপ্তরের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন।
এমতাবস্থায় মামলাকারী মোহাম্মদ শাকিল ওয়ারসির আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি বাতিলের আবেদন জানান। তার বক্তব্য, ১৯৫০ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করছি। রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হোক। যারা ইতোমধ্যেই গরু কিনে ফেলেছেন, তাদের জন্য আইন শিথিল করা হোক।

আরেক মামলাকারীর তরফে আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যে সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেটা কে দেবে? সেই পরিকাঠামো কোথায়? কসাইখানা কোথায়? কোরবানির জন্য লোক যাবে কোথায়? রাজ্য জানে এটা করা সম্ভব নয়। সারা দেশেই ১৪ বছরের বেশি বয়সি গরু কোরবানির যে কথা বলা হয়েছে সেটা কীভাবে সম্ভব?’

আরেক মামলাকারী মোহাম্মদ জাফর ইয়াসনির বক্তব্য, কর্তৃপক্ষ যেন আইনের বিধি মেনে ঈদের কোরবানির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেন। সরকার অনুমোদিত কসাইখানার তালিকা প্রকাশ করুক। সাধারণ নাগরিকের যাতে কোনো রকম বেআইনি হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করুক আদালত।

তিনি আরও বলেন, রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি জবাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনসাধারণের জন্য নোটিশ। এই বিষয়ে ১৯৫০ সালের আইনের নিয়মে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে জবাইয়ের জন্য ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ লাগবে। কিন্তু এই রাজ্যে ‘ফিটনেস প্রশংসাপত্র’কে দেবে, সেই পরিকাঠামোই নেই। এর আগে আদালত রাজ্যকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মামলাকারীর বক্তব্য, অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর মানুষও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের আইনের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি, কিন্তু তারা কোথায় যাবেন? পশু চিকিৎসক কারা? সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই।

তিনি আরও বলেন, আগামী ২৮ মে উদযাপিত হবে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। তার আগে তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। রাজ্যের উচিত ছিল, সব পক্ষের সঙ্গে ওই বিষয়ে আলোচনা করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই আইন কার্যকর করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা। একটি গরুর গড় আয়ু প্রায় ১৫ বছর, তাহলে হঠাৎ করে ১৪ বছরের গরু খুঁজে পাওয়া কীভাবে সম্ভব?

পাল্টা ‘প্রাণী হত্যা’ বন্ধের স্বপক্ষে ও আইনের পক্ষে মামলাকারী রামকৃষ্ণ পালের বক্তব্য, গরু জবাই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হোক। এমনকি সমস্ত ধরনের জবাইয়ের উপরে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করুক আদালত। কোরবানি ঈদের নামে নিরীহ ও বোবা পশুদের হত্যা করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ‘বলিদান’-এর অর্থ কোনো পশুকে হত্যা করা নয়, বরং নিজের ভেতরের পশুসুলভ প্রবৃত্তিকে দমন করা।

প্রাণী হত্যা বন্ধের পক্ষে আরেকটি মামলায় আইনজীবী দেবযানী দাশগুপ্ত বলেন, ‘কোরবানি ঈদে সমস্ত রকম কোরবানি দেওয়া বন্ধ করার আর্জি জানিয়েছি। ধর্মীয় কারণে কোনোপ্রাণীর বলি বা কোরবানি দেওয়া বন্ধ করা হোক৷’

যদিও জমিয়ত ই-উলামাসহ চারটি মামলায় আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, আমরা রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট আইনের সাংবিধানিক বৈধতা—উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করেছি। ১৯৫০ সালের আইনটির উদ্দেশ্য ছিল, পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ করা। কৃষিকাজের স্বার্থে পশু সংরক্ষণ করা উচিত, তাই ওই আইন আনা হয়। কিন্তু এখন আর কৃষিকাজ গরু বা মহিষের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে।

তিনি বলেন, পরিসংখ্যান বলছে, গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুধ উৎপাদনও বেড়েছে। মোট গবাদি পশুর জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশেরও বেশি গরু। গরুর সংখ্যা ১.৩ শতাংশ বেড়েছে। পুরুষ গবাদি পশুর সংখ্যা কমলেও, স্ত্রী গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরপ্রদেশে গবাদি ‘পশুহত্যা’ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ, তবুও সেখানে গরুর সংখ্যা কমছে। আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে।

বিকাশের ভাষ্য, ওই আইনটি সেসব পৌর এলাকায় কার্যকর, যেগুলো ১৯৫২ সালে পৌরসভা ছিল। এর বাইরে নয়। কারণ, আইনটি ১৯৫২ সালেই কার্যকর হয়েছিল। ফলে কলকাতা ও কালিম্পংয়ের বাইরে এই আইন কার্যকর করা উচিত নয়। আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো পশু জবাই করতে পারবেন না’। কিন্তু এই আইনের অধীনে পঞ্চায়েত সমিতিগুলোকে কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞাপিত করা হয়নি। কোনো জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে একটি পশুর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব?

তার দাবি, আইনে বলা হয়েছে, প্রশংসাপত্র দিতে অস্বীকার করলে কোনো ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্যের কাছে আপিল করতে পারবেন। অর্থাৎ আইনে আপিলের অধিকারটি বাধ্যতামূলক। আর বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে গত ১৩ মে। বলা হয়েছে, ধর্মীয়, চিকিৎসা বা অন্যান্য বিশেষ উদ্দেশ্যে এই আইন প্রযোজ্য হবে না, যতক্ষণ না তা প্রতিবেশীদের ধর্মীয় অনুভূতি বা আইনশৃঙ্খলার ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ ধর্মীয় উদ্দেশ্যের জন্য আইনেই ব্যতিক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। কোনও আইন যদি দীর্ঘদিন কার্যকর করা না হয়, তবে তার কার্যকারিতা ক্ষীণ হয়ে যায়।

এই আইনজীবীর মতে, মানুষ এখানে কোনো প্রদর্শনীর জন্য আসেননি। গরুর হাট বন্ধ হয়ে গেছে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে না পেরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক নই, কিন্তু সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অন্য ধর্মের সঙ্গে যুক্ত গবাদি পশু ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জবাইয়ের জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। কোনো পশুকে জবাইয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করা হলে, পৌরসভা অনুমোদিত জবাইখানায় জবাই করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন কতগুলো কেন্দ্র রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এর পরেই পঞ্চম মামলাটি করেছিলেন মেঘনাদ দত্ত। তার আইনজীবী বলেন, ২০১৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নিশিথা মাত্রের নির্দেশ ছিল বেআইনি বাজার বন্ধ করার পাশাপাশি সরকার নির্দিষ্ট জায়গায়তেই শুধু বলি বা কোরবানি করা যাবে৷ রাজ্যকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দেয় আদালত।

আইনজীবী সাদান ফারাজ বলেন, যে কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে যে পশু বলি দেওয়া হয়, তাতে সুস্থ পশুই বলি দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই নোটিফিকেশন শুধু নির্দিষ্ট পৌর এলাকার জন্যই, এটা আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য আগেই বলেছেন।

পাল্টা কেন্দ্রের অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী বলেন, ‘রাজ্য যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তা কলকাতা হাইকোর্টের ২০১৮ সালের একটা নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই ৷’ সুপ্রিম কোর্টের লার্জার বেঞ্চ নির্দেশে জানিয়েছিল, কোরবানি ঈদে গরু জবাই করা কোনো অধিকার নয়।

১৯৫০ সালের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নির্দেশিকা জারি করেছে। সেখানে ১৯৫০ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। ফলে এখন প্রশাসন যে নির্দেশ জারি করেছে, সামাজিক স্বার্থে তা মানতে বাধ্য সবাই। পাশাপাশি পাচারের কারণে গরু এমনিতেই কমে যাচ্ছে রাজ্যে। এটা শুধু রাজ্যে নয়, সারা দেশে একই আইন৷
রাজ্যের সিনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সিল নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, এই বিজ্ঞপ্তি হাইকোর্টের একটা নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই দেওয়া হয়েছে৷ হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি৷ এখানে নতুন কিছু নেই৷

রাজ্য: যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, তা কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে। অথচ কেউ হাইকোর্টের নির্দেশে রিভিউ চায়নি, শুধু বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আর এটা রাজ্যের পলিসি ডিসিশন। সেটা কি জনস্বার্থ মামলায় চ্যালেঞ্জ করা যায়! রাজ্য শুধুই হাইকোর্টের নির্দেশ পালনের চেষ্টা করছে।

কেএমসি: বছর বছর এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে। আর এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর নির্দেশ অনুযায়ী বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি পেপারে তার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, যাতে জনসাধারণ জানতে পারে। ফলে কেউ দাবি করতে পারবে না, ব্যাপারটা হঠাৎ জারি হয়েছে এবং তার জানা নেই৷ ৬১০টি ঘটনায় পদক্ষেপ করা হয়েছে ১৯৫০ সালের আইনের বিধি মেনে৷ কেএমসি'র চিহ্নিত স্লটার হাউস আছে, অফ আছে, আছে কর্মী-চিকিৎসকও।

সব পক্ষের বক্তব্য শুনে হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানায় যদি এই আইন কার্যকর না থাকত, তাহলে এতগুলো মামলা দায়ের করারই কোনো প্রয়োজন হতো না। প্রতি বছর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। তাহলে কি এটা বলা ন্যায্য হবে যে আইনটি কার্যকর ছিল না?

এর আগে বুধবার তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানের তারা মামলায় আদালতের কাছে দাবি জানায়, উৎসবের জন্য সরকারি নির্দেশিকায় কিছুটা ছাড় দেওয়া হোক।

কিন্তু ১৩ মের সরকারি নির্দেশিকার ফলে বহু মানুষ বিপাকে পড়েছেন।

আখরুজ্জামানের সঙ্গে আদালতে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও। তিনি বলেন, কোরবানি ইদ মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ওই আইনের ১২ নম্বর ধারায় একটি ছাড় রয়েছে, তা সামনে রেখে ছাড় চাওয়া হচ্ছে। তিনি এও বলেন, গরু বাদ দিলে মহিষ অথবা বলদ কোরবানির অনুমতি দেওয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, গরু জবাই বন্ধ হয়ে গেলে অনেক হিন্দুরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এই নিয়মের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে এবং ধর্মীয় রীতিনীতিতেও হস্তক্ষেপ হবে।