চট্টগ্রামের হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন করতে দেখা গেছে। গত শনিবার দুপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিন জুয়েলের দপ্তরের সামনে তার পিয়ন নঈমকে ঘুষ নিতে দেখা যায়। একই সময় দোতলায় উচ্চমান সহকারী ওবায়দুল আকবর ক্যাজুয়াল স্টাফ নুর উদ্দিন মুন্না থেকে একটি নতুন আবাসিক সংযোগের জন্য টাকা নেন। দুটি ঘটনার ঘুষ লেনদেনের ভিডিও এ প্রতিবেদকের কাছে আছে। কয়েক দিন ধরে চলা দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে ঘুষ লেনদেনসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসে।
জানা যায়, হাটহাজারী বিদ্যুৎ অফিসে ঘুষ লেনদেন নিত্যনৈমেত্তিক ঘটনা। নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার বাণিজ্য, টেম্পার টোকেন, সঞ্চালন লাইন ও খুঁটি সরানোসহ কোনো কাজই এখানে ঘুষ ছাড়া হয় না। অনিয়মই যেন এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা এখানে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আর এ সিন্ডিকেটে আছেন দুইজন সহকারী প্রকৌশলী, উচ্চমান সহকারী ওবায়দুল আকবর, লাইনম্যান আলমগীর ও পিয়ন নঈম। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গ্রাহক সেবার নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত শনিবার দুপুর ১টায় হাটহাজারী বিদ্যুৎ অফিসে যান এ প্রতিবেদক। সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিন জুয়েলের দপ্তরের সামনে তিনজন সেবাপ্রার্থীর জটলা দেখতে পান তিনি। তাদের সঙ্গে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলীর পিয়ন নঈম। কথাবার্তার একপর্যায়ে সেবাপ্রার্থী তিনজনই মানিব্যাগ টাকা বের করেন নঈমকে দেওয়ার জন্য। এ সময় তাদের একজনকে এক হাজার টাকার নোট দিতে দেখা যায় নঈমকে। এ প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্য দুজন টাকা নিজেদের কাছে রেখে দেন।
একই সময় দোতলায় উচ্চমান সহকারী ওবায়দুল আকবরের কক্ষে ক্যাজুয়াল স্টাফ নুর উদ্দিন মুন্না নতুন একটি আবাসিক সংযোগের ফাইল নিয়ে আসেন। এ সময় ফাইলটির জন্য ওবায়দুলের হাতে কিছু টাকা দেন মুন্না। তাকে কোনো রশিদ না দিয়ে টাকাগুলো পকেটে রেখে দেন ওবায়দুল। ওবায়দুলকে ঘুষ দেওয়া প্রসঙ্গে নুর উদ্দিন মুন্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে পাওনা বাবদ ৬০০ টাকা ওবায়দুল সাহেবকে দিয়েছি। সেটা কোনো ঘুষ ছিল না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে তিন সেবাপ্রার্থী পিয়ন নঈমকে টাকা দিয়েছেন, তারা এসেছেন প্রিপেইড মিটার আনলকের জন্য ‘টেম্পার টোকেন’ সংগ্রহ করতে। টোকেন দেওয়ার জন্য একজন অস্থায়ী কর্মচারী রেখেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন। ওই কর্মচারী একটি ল্যাপটপ নিয়ে বসেন দোতলায় সহকারী প্রকৌশলী রিয়েল আহমেদ নয়নের কক্ষের সামনে। তিনি প্রতি টোকেনের বিনিময়ে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা নেন। প্রতিমাসে অন্তত ২৫০ টেম্পার টোকেন দেওয়া হয়। এ হিসাবে প্রতি মাসে টোকেন খাতে অন্তত সোয়া লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়।
১৩৮ টাকার ফি ২৫শ টাকা : মিটার লক খুলে দেওয়া বাবদ (টেম্পার টোকেন) সরকারি ফি ৫৫০ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি কিলোওয়াট লোড বৃদ্ধির জন্য ১৩৮ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ২৫শ টাকা। থ্রি-ফেইজ সংযোগের ক্ষেত্রে দেড় থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিমাসে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি থ্রি-ফেইজ সংযোগের আবেদন জমা পড়ে। সম্প্রতি হাটহাজারী সদর কাচারি রোডে ‘সিটি সেন্টার’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিধিভঙ্গ করে সংযোগ দেওয়া হয়। কোনো বাসা-বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানে লোড ৮০ কিলোওয়াটের বেশি হলে প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শক অফিস থেকে পরিদর্শনপূর্বক নিরাপত্তা সনদ না দেওয়া পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর সংযোগ দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু সিটি সেন্টারে সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয়নি। লোড বৃদ্ধি ও টোকেন বাবদ ঘুষের টাকা গ্রাহকদের থেকে পিয়ন নঈম ও অস্থায়ী ওই কর্মচারী গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিনামূল্যের মিটারে নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা : প্রি-পেইড মিটার সরকার বিনামূল্যে দিচ্ছে। এর জন্য বিভিন্ন খরচসহ সাকুল্যে ৭০০ টাকার মতো সরকারি খরচ পড়ে। অথচ হাটহাজারী বিদ্যুৎ অফিসে একেকটি মিটারের জন্য ৭ থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত ১৮ মে দুপুরে গ্রাহক সেজে হাসিব নামে একজনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। অ্যানালগ মিটার পরিবর্তন করে নতুন প্রি-পেইড মিটার লাগাতে কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে হাসিব নামে একজন বলেন, ‘সরকারি মিটার লাগালে সাড়ে ৭ হাজার টাকা আর বেসরকারি মিটার লাগালে সাড়ে ১০ হাজার টাকা খরচ পড়বে।’ নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ২০ হাজার মিটার গ্রাহকদের বাসা-বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে লাগানো হয়। এ সময়ে শুধু প্রি-পেইড মিটার খাতে গ্রাহক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সিন্ডিকেটটি হাতিয়ে নেয়।
৪৯ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সঞ্চালন লাইন অপসারণ : হাটহাজারীর মেখল রোডের প্রবেশ মুখ থেকে দক্ষিণে আজিম নগর পর্যন্ত প্রায় কোয়ার্টার কিলোমিটার ৩৩ হাজার কেভি ক্ষমতার সঞ্চালন লাইন রাতের আঁধারে সরিয়ে ফেলে ওই বিদ্যুৎ অফিসের সিন্ডিকেট। গত রমজানে লাইনটি সরিয়ে হাটহাজারী-নাজিরহাট সড়ক দিয়ে দক্ষিণে বাইপাস করে দেওয়া হয়। ৪৯ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো তৈরির সুবিধা করে দিতে লাইনটি সরানো হয় বলে এলাকায় প্রচার আছে।
হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে আসার আগে চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট শাখার দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন। তিনি শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড শাখার কার্য নির্বাহী কমিটির ত্রাণ, সমাজকল্যাণ ও ক্রিড়া সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সুবর্ণজয়ন্তী ও মহান স্বাধীনতা দিবস-২০২৩ উপলক্ষে ‘পিতা’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে সংগঠনটি। স্মরণিকায় ‘বঙ্গবন্ধু : বাঙালি ও বাংলার স্বপ্ন সারথি’ শীর্ষক নিবন্ধ লেখেন জুয়েল।
নিজ কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে আপনাকে জানাব।’ এ ছাড়া অন্যান্য অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি।
হটিহাজারীতে বিদ্যুৎ পরিষেবার নামে গ্রাহক থেকে ঘুষ আদায়, বিধি লঙ্ঘন করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সংযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে আমাকে দেন। আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। তথ্য থাকলে নিউজ করেন। আমাদের আপত্তি নেই। তবে কাউকে হয়রানি করার জন্য নিউজ করা উচিত না।