Image description

ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি বাঁকে গিরগিটির মতো রং পাল্টে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলকে ধোঁকা দেওয়া এক মহাপ্রতারকের নাম মাহামুদুল হাসান। শিক্ষা বলতে ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস। অথচ নামের আগে লাগিয়েছেন ‘প্রফেসর’। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (এনএইউ) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন—এমন দাবিতে লাগান ‘ড.’ তকমাও। আর এ মিথ্যা পরিচয়ে দেশের নর্থ সাউথ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি, বাংলাদেশের (এআইইউবি) মতো নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন।

প্রতারণাকে পেশা বানানো এ ব্যক্তি ক্ষমতার শীর্ষ স্তরে জায়গা পেতে কখনো বনে গেছেন রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের উপদেষ্টা, আবার ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাগিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদও। কিন্তু আভিজাত্যের এ চটকদার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিকৃত ও নৃশংস অপরাধীর চেহারা। কালবেলার অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে তার একাধিক বিয়ে এবং অনেক নিরীহ নারীর জীবন ধ্বংসের রোমহর্ষক অধ্যায়। শ্বশুরবাড়ির ১৫ বছরের এক কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণের দায়ে জেল খাটার অকাট্য প্রমাণও মিলেছে তার বিরুদ্ধে। ওই মামলায় পরবর্তী সময়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সাক্ষীদের আদালতে না যেতে বাধ্য করা হয়। একই সঙ্গে নিজের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে ১৬ বছরের প্রথম সন্তান, সাবেক স্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করেন।

এই মহাপ্রতারক মাহামুদুল হাসান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুয়া সংস্কারক সেজে প্রতারণার জাল বিছিয়ে ছিলেন সারা দেশে। ক্ষমতার দম্ভে আইন, সমাজ ও পরিবারকে জিম্মি করা এ কাল্পনিক ‘ভিআইপি’ দুই যুগের বেশি সময় ধরে ছিলেন মুখোশের আড়ালে।

ছাত্রজীবনেই প্রতারণার হাতেখড়ি: কালবেলার অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহামুদুল হাসানের প্রতারণার জাল বিছানো শুরু হয়েছিল তার ছাত্রজীবন থেকেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ আওয়াল সম্পর্কে মাহামুদুলের মায়ের মামা। এ সুবাদে ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টারে বিবিএতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পড়াশোনা না করে সেখানে শুরু করেন ভর্তি বাণিজ্য। এরপর এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলেকে নর্থ সাউথে ভর্তিতে সহায়তার সূত্রে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। ওই পরিবারের সহায়তায় পাড়ি জমান লন্ডনে।

যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পরই তার জালিয়াতির পরিধি আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। যার ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়। একই সঙ্গে ‘ই-ফাইভ-কাউন্সিল’ নামে একটি নামসর্বস্ব সংগঠন খুলে নিজেকে সেটির চেয়ারম্যান দাবি করেন। দেশের মন্ত্রী, এমপি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে ‘বিদেশি ডেলিগেট’ আনার লোভ দেখিয়ে শিডিউল চাইতেন। এ ছাড়া লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন। ২০০৯ সালের দিকে এ ভয়াবহ জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়ায় মাহামুদুলের ওপর যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান’ জারি করা হয় বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগার ও শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জালিয়াতির দায়ে যুক্তরাজ্য থেকে বিতাড়িত মাহামুদুল কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। তবে চতুর এই বাজিকর দ্রুতই নিজের রাজনৈতিক রং বদলে ফেলেন। একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন কট্টর আওয়ামী লীগার। নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ পরিচয় দিয়ে দেশে এক নতুন প্রতারণার জাল পাতেন।

প্রতারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মাহামুদুল ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি নামসর্বস্ব এনজিও খোলেন। এই ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্যাড ব্যবহার করে তিনি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিদেশি প্রতিনিধিদের মেইল পাঠিয়ে বৈঠকের সময় (শিডিউল) বের করতেন। পরবর্তী সময়ে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এবং বিভিন্ন স্থানে র্যাব মহাপরিচালকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ভুয়া লোকেশন ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে নিজেকে একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ভিআইপি হিসেবে জাহির করতেন। ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টের এ সাজানো আভিজাত্যকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং নর্থ সাউথ ও এআইইউবির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মহলের সঙ্গে লবিং করে বড় অঙ্কের অর্থবাণিজ্যের ফাঁদ পাততেন।

দেশে-বিদেশে সব প্রতারণায় মাহামুদুল ব্যবহার করেন তার স্ত্রীদের ঠিকানা। তিনি কখনো নিজের বাসায় থাকতেন না। থাকতেন শ্বশুরালয় বা অন্য স্ত্রীদের বাসায়। এ কারণে মাহামুদুল হাসানের প্রতারণার দায়ভার বর্তায় স্ত্রী ও তার পরিবারের ওপরে। অনুসন্ধানে স্ত্রীদের বিরুদ্ধে মাহামুদুলের দায়ের করা একাধিক মামলা এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার কপি এসেছে কালবেলার হাতে।

মাহামুদুল হাসানের ফেসবুক আইডি বিশ্লেষণ করে কালবেলা দেখতে পায়, ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ মাহামুদুল হাসান নিজের ফেসবুকে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের লোকেশন অ্যাটাচ করে লিখেছেন ‘উইথ হার এক্সেলেন্সি শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার, গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ।’ এর কিছুদিন আগে ১৫ মার্চ গণভবনের লোকেশন শেয়ার করে লিখেছেন ‘উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার’। ২০২১ সালের ১৪ মার্চ লিখেছেন ‘মিটিং উইথ ডিরেক্টর জেনারেল র্যাব’ এবং ‘ফরমার হোম স্টেট মিনিস্টার অ্যাট বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্লামেন্ট’।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের পর মাহামুদুল হাসানের আনাগোনা বাড়ে বিভিন্ন দূতাবাসে। এ সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে ছবি তোলেন। এখনো মাহামুদুল সেসব ছবি ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে তার প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

শ্বশুরবাড়ি গিয়ে গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ: আদালতে খোঁজ নিয়ে মাহামুদুল হাসানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলা ও তার দায়ের করা আরও বেশকিছু মামলার তথ্য পায় কালবেলা। ধর্ষণ মামলার এজাহারে বলা হয়েছে—শ্বশুরবাড়ি গিয়ে গৃহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান মাহামুদুল। এ ঘটনায় তার বিকৃত যৌনাচার এবং নানা সময় প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে ওই স্ত্রী তাকে তালাক দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি ছিলেন মাহামুদুলের দ্বিতীয় স্ত্রী।

ধর্ষণের ওই মামলার তদন্তে মাহামুদুলের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় মিরপুর থানা পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেওয়া হয় আদালতে। যার অভিযোগপত্র নং-৩১৬, তারিখ: ২৭/৮/২০২০। মেডিকেল রিপোর্টেও গৃহপরিচারিকা ১৫ বছরের ওই কিশোরীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কয়েক মাস জেলও খাটেন। পরে জামিনে বের হয়ে সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি দেন। সে সময় তিনি নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দেন। তার হুমকি-ধমকির কারণে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ায় বিচারক মাহামুদুলকে খালাস দেন। যদিও সে মামলায় পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেওয়া অন্তত চারটি জবানবন্দি সংগ্রহ করেছে কালবেলা।

ওই সাক্ষীদের একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তার নাম মো. নুর মোহাম্মদ। তিনি সম্পর্কে মাহামুদুল হাসানের সাবেক স্ত্রীর মামা। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘মাহামুদুল আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। আমার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। আমার ভাগনিটা খুবই ভালো ছাত্রী ছিল। জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি। ভাগনির ঘরে দুটি সন্তান রয়েছে। একটি ছেলে, একটি মেয়ে; তারা হাফেজ। আমার ভাগনি তার সন্তানদের কথা ভেবে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। ও (মাহামুদুল) আমার ভাগনির জীবনটা ধ্বংস করে দিল।’

মামলায় সাক্ষী দিতে কেন গেলেন না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই সময় যাওয়ার সুযোগ কই! সে তখন শেখ হাসিনার লোক। জীবন না বাঁচলে বিচার দিয়া কী করমু!’

২০টি সংস্কার কমিশনে কাজ করার দাবি: মাহামুদুল তার অন্য এক স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার একটি মানহানির মামলা দায়ের করেছেন আদালতে। সে মামলায় তিনি নিজেকে ভিআইপি প্রমাণ করতে দাবি করেছেন—তিনি দেশি-বিদেশি কয়েকডজন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছেন। সরকারে উচ্চপর্যায়ে এবং বিদেশি হাই অফিসিয়ালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। মামলার অভিযোগের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাদী বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত ও মূল্যায়নাধীন একাধিক সংস্কার নির্দেশিকা প্রণয়ন ও দাখিলে অংশগ্রহণ করেছেন। ওই সংস্কারগুলো হলো—আন্তর্জাতিক ঋণ নীতিমালা (বৈদেশিক ঋণ ও এখতিয়ার) পুনর্বিবেচনা ও সংস্কার, পররাষ্ট্র প্রশাসনের সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংস্কার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, জনপ্রশাসনের সংস্কার, সংবিধানের সংস্কার, পুলিশ ব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার, সাইবার প্রযুক্তির সংস্কার, ব্যবসায়িক প্রযুক্তির সংস্কার, বুদ্ধিমান পরিবহন ব্যবস্থার (ইনটেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম) সংস্কার, বিচার বিভাগের সংস্কার, শিক্ষা খাতের সংস্কার, সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর সংস্কার, তৃণমূল পর্যায় থেকে উৎপাদন ও বিতরণ নীতিমালার সংস্কার, দেশীয় ও প্রবাসী জনশক্তি ব্যবস্থাপনার সংস্কার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার-সংক্রান্ত আইনের সংস্কার, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) অনুদান নীতিমালার সংস্কার এবং ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সংস্কার।’

মাহামুদুল হাসান এমন ২০টি সংস্কার কমিশনে কাজ করার দাবি করলেও বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল ১১টি। সেই ১১ কমিশনের সদস্যদের তালিকা খুঁজে কোনোটিতেই মাহামুদুল হাসানের নাম পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে যোগাযোগ করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের সঙ্গে। তিনি মাহামুদুল হাসানের সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি উনাকে চিনি না। পারসোনাল ক্যাপাসিটিতে বলতে পারি—আমি উনাকে চিনি না।’

বিবিএতে ভর্তি হলেও কোর্স শেষ করেননি: ১৯৯৯ সালে মাহামুদুল হাসান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে ভর্তি হন। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভর্তি হলেও কোর্স শেষ করেননি তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আহমেদ তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কালবেলা। মাহামদুল হাসানের বাবা-মায়ের নাম, জন্ম তারিখ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রার দপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রার আহমেদ তাজমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে গত ৭ এপ্রিল কালবেলাকে দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘এম মাহামুদুল হাসান ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টার থেকে ২০০৩ সালের সামার সেমিস্টার পর্যন্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। আমাদের নথি অনুযায়ী, তিনি এনএসইউ থেকে তার পড়াশোনা সম্পন্ন করেননি।’

সাবেক স্ত্রীর বয়ানে প্রতারণা-জালিয়াতি-নির্যাতনের রোমহর্ষক তথ্য: আরও বিস্তারিত জানতে কালবেলা খুঁজে বের করে মাহামুদুলের সাবেক স্ত্রীকে, যার সঙ্গে এক যুগ আগে বিচ্ছেদ হয়েছে। প্রথমে তিনি ভয়ে কথা বলতে চাননি। নিজের ও একমাত্র সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে তিনি ও তার পরিবার মাহামুদুলের একের পর এক ভুয়া মামলায় জর্জরিত।

অনেক চাপাচাপির পর তিনি বলতে শুরু করেন, মাহামুদুল তিন দিনের সরকারি সফরের কথা বলে হঠাৎ বিয়ে করেন। পরে জানা যায়, তিনি লন্ডনে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এসব অভিযোগে তার ‘ইউকে ইমিগ্রেশন ব্যান’ হয়। পরে মাহামুদুল অন্য পাসপোর্ট ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার এমন একের পর এক প্রতারণার প্রতিবাদ করলে মাহামুদুল তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন। একদিন শারীরিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তখনই জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বিষয়টি স্বামীকে জানালে তিনি সন্তান নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গর্ভপাতের জন্য চাপ দেন। তখনই তার প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসে। সিদ্ধান্ত নেন এ প্রতারকের সঙ্গে আর সংসার করবেন না। অনাগত সন্তানকে পৃথিবীতে এনে একাই তাকে লালন-পালন করবেন।

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তালাক দেওয়া যায় না, সেই চিন্তা থেকে তখনো মাহামুদুলের সঙ্গে সংসার চালিয়ে যান ওই নারী। কিন্তু দিন দিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলছিল। ওই নারী বলেন, ‘মাহামুদুলের করা একের পর এক ভুয়া মামলায় আমি ও আমার পরিবার জর্জরিত। আত্মীয়স্বজন, এমনকি বৃদ্ধ মা-বাবার নামেও জঙ্গি মামলার অভিযোগ দেওয়া হয়। র্যাব বা পুলিশ বলত, এসব অভিযোগ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসেছে। পরে থানায় গিয়ে প্রমাণ দিতে হতো মাহামুদুল আসলে একজন প্রতারক।’

তিনি আরও বলেন, ‘সন্তান জন্মের পর মাহামুদুল ও তার পরিবার যৌতুকের জন্য আমার পরিবারকে চাপ দিতে থাকে। টাকা না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধে মামলা করে এবং টাকার জন্য অপহরণের চেষ্টাও করে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ গণমাধ্যমগুলোকে বিভ্রান্ত করেছেন। আমার বাবার অফিসে গিয়ে তাকে দুর্নীতিবাজ বলে শাসাতেন। পুরো গর্ভাবস্থায় আমি একা ছিলাম। তার অত্যাচারে পরিবারও আমার ওপর বিরক্ত হয়ে পড়ে। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম গর্ভের সন্তান কবে পৃথিবীতে আসবে। শেষে সন্তান জন্মের পরপরই আমি তাকে ডিভোর্স দিই।’

ওই নারী জানান, তার ছেলের বয়স এখন ১৬ বছর। এই ১৬ বছর একাই লড়াই করে সন্তানকে লালন-পালন করেছেন, ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সুস্থ পরিবেশে বড় করে তুলেছেন। প্রতিদিন তার একটাই চিন্তা ছিল—সন্তান ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, নিরাপদ ও সুস্থ আছে কি না। সন্তানের জন্য তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলটাইম চাকরি ছেড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম ক্লাস নিয়েছেন অতিরিক্ত খরচ জোগাতে।

ওই নারী আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর মাহামুদুল পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে আমার ঠিকানা ও সন্তানের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেন। কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে তাকে আবার আমাদের পেছনে লাগিয়ে দেন। মাহামুদুল সন্তানের মানসিক অবস্থার কথাও ভাবেননি এবং শুধুই হয়রানির উদ্দেশ্যে একের পর এক মামলা করে ছেলের ইমিগ্রেশন আটকে রেখেছেন। ফলে আমি ছেলেকে রেখে ওমরা, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা বা ভ্রমণের জন্য বিদেশেও যেতে পারছি না।’

সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার বর্ণনায় মাহামুদুল হাসান: এআইইউবিতে গেস্ট টিচার হিসেবে চাকরি করেছেন মাহামুদুল হাসান। সেখানে মাহামুদুল হাসানের ছাত্র ছিলেন— এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে কালবেলার। তাদের একজন সাবেক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘২০১২-২০১৩ সালের দিকে আমি তখন মেজর পদবির একজন অফিসার হিসেবে ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলাম। একই সময়ে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আমি এআইইউবিতে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হই। সেখানে এইচআর কোর্সের প্রথম ক্লাসে একজন ফ্যাকাল্টি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মাহামুদুল হাসানের সঙ্গে। প্রথম দিন তিনি কোনো একাডেমিক ক্লাস না নিয়ে মূলত উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা করেন এবং ইউকেতে থাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড নেন। তিনি ক্লাসে না পড়িয়ে নিজেকে শো-অফ করতেন। যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি সারা দিন কাজ করেন। তিনি এত ব্যস্ত যে সেনাপ্রধান, পুলিশ প্রধানসহ বিভিন্ন হাই অফিসিয়াল তার কাছে সহায়তা চান, কিন্তু তিনি যেতে পারেন না।’

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কয়েকদিন পর মাহামুদুল হাসান আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমার কাছে ডিজিএফআই মহাপরিচালকের সঙ্গে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন—একজনের কাছে তিনি ৫ লাখ টাকা পাবেন, ওই ব্যক্তি টাকাটা দিচ্ছেন না। পরে আমি তাকে বলি—এ বিষয়ের জন্য আপনি ডিজিএফআইয়ের ডিজির কাছে যাবেন! আপনি তো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বললেই পারেন। পুলিশ প্রধানের সঙ্গেও তো শুনেছি আপনার ভালো সম্পর্ক, তাকে বললেও পারেন। তখন তিনি বলেন, এত ছোট বিষয়ে তাদের বলা যায় না। আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য হয়ে এমন অনুরোধ এবং তার আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। ফলে আমি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাই।’

খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে জানতে পারি সেখানে আমার অন্য ক্লাসমেট ছিল এসএসএফে—তাকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শিডিউল নিয়ে দেওয়ার জন। আরও অন্য যারা সহপাঠী ছিল সবাইকে উনি বিভিন্ন জায়গায় লিংক-লবিং করিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকেন। পরে আমার নিজেরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নিই উনাকে আমরা কোথাও লিংক করিয়ে দেব না। এরপর উনি ক্লাসে আমাদের থ্রেড দিতে থাকেন যে— কোর্সে নম্বর কম দেবেন! পরে আমরা এআইইউবি কর্তৃপক্ষকে তার বিষয়ে বলি, কিন্তু তারা জানায়—উনার রেফারেন্স (উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশ) আছে। রেফারেন্সের জন্যই নেওয়া (চাকরিতে) হয়েছে।’

জামায়াত আমিরের উপদেষ্টার পদ পান যেভাবে: ৫ আগস্টের পর কিছুদিন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে লিংক-লবিং করার চেষ্টা করেন মাহামুদুল। এ সময় তিনি তার সঙ্গে থাকা পুরোনো ছবি ব্যবহার করেন। পরে বিষয়টি তার পূর্বপরিচিত এক সাংবাদিকের নজরে এলে তিনি বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জানান। এরপর তার সেখানে ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও জায়গা না পেয়ে সর্বশেষ আশ্রয় নেন জামায়াতে ইসলামীতে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি যাতে আবারও প্রতারণা চালিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য জামায়াতকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। সুচতুর মাহামুদুল একপর্যায়ে গত বছরের ডিসেম্বরে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে নেন। কিন্তু জামায়াত আমিরের অনুমতি না নিয়ে নিজেকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করে দলীয় প্যাডে চিঠি পাঠান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বিষয়টি জানাজানি হলে জামায়াত আমিরের উপদেষ্টার পদসহ জামায়াত ইসলামী থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য: জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের কালবেলাকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২৬-এর জানুয়ারি পর্যন্ত উনি (মাহামুদুল হাসান) আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। উনার সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক কোনো সম্পর্ক নেই। ২৪-পরবর্তী সময়ে আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে যোগাযোগ শুরু হয়। তখন যোগাযোগ রক্ষার্থে হাইকমিশন বা দূতাবাসে যে চিঠি দেওয়া লাগে, সেজন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। উনার একটা ফার্ম আছে, উনি এসব কাজ করেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে উনাকে আমিরে জামায়াতের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে কালবেলাকে কোনো সাড়া দেননি মাহামুদুল: অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাহামুদুল হাসানের সঙ্গে সব ধরনের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পরিচয় দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত বার্তা পাঠানো হয়। তারও কোনো জবাব দেননি তিনি। তবে একবার মোবাইল ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর আর কোনো কথা বলেননি। প্রায় ৪৪ সেকেন্ড ফোন লাইনে নীরব থাকার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

পরবর্তী সময়ে তার ওয়েবসাইটে উল্লেখ থাকা তিনটি টিঅ্যান্ডটি নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে একটি নম্বরে ফোন রিসিভ করা হলেও ওপাশ থেকে কোনো কথা বলা হয়নি। একই নম্বরে তিনবার ফোন দিলে দুইবার রিসিভ করা হয়—একবার ১২ সেকেন্ড এবং আরেকবার ৪১ সেকেন্ড সংযোগ চালু থাকলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ সময় ফোনের এপাশ থেকে বারবার পরিচয় দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। নম্বরটির ট্রুকলার তথ্যেও তার নাম প্রদর্শিত হয়।

সবশেষে তার বক্তব্য জানার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট ১২টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। বার্তাগুলো ডেলিভার হলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি এবং এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি।