একটি সাত বছরের শিশুর পিঠে থাকার কথা ছিল রঙিন স্কুলব্যাগ। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার চঞ্চল পায়ে ছুটে যাওয়ার কথা ছিল বিদ্যালয়ের আঙিনায়। কিন্তু মে মাসের এক সকালে, রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের বন্ধ কক্ষের ওপাশে ওত পেতে ছিল এক নরপিশাচ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চঞ্চল শৈশব রূপান্তরিত হলো একটি মস্তকবিহীন নিথর দেহে। ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং পুরো সমাজ ও নাগরিক বিবেককে এক চরম ঝাঁকুনি দিয়েছে।
প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ওরফে জাকির হোসেন (৩০) বুধবার (২০ মে) আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে আইনের চাকা ঘুরলেও, নিহত শিশুর পিতা আবদুল হান্নান মোল্লার বুকফাটা হাহাকার আর বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম আক্ষেপের বাণী এখন পুরো এলাকার বাতাসে ভাসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন— "আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। কোনো পদক্ষেপ নেবেন? আপনি পারবেন না। আরেকটা বড় ঘটনা ঘটবে, এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। শেষ।"
দরজার বাইরে মায়ের আকুতি, ভেতরে চলছিল যমদূত
পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি ভবনে সপরিবারে বসবাস করে আসছেন শিশু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা ও মা। পেশাগত কারণে তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত। অন্যদিকে, পেশায় রিকশা মেকানিক সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে একই ভবনের ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসে। প্রতিবেশী হওয়ায় শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের পরিচয়ও তৈরি হয়েছিল। সেই পরিচয়ই কাল হয়ে দাঁড়ায় রামিসার জন্য।
হত্যাকাণ্ডের দিন গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হওয়ার পর কৌশলে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। এরপর সেখানে ঘটে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড। সকাল গড়িয়ে গেলেও মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মা পারভীন আক্তার। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার ছোট্ট স্যান্ডেল দেখতে পান তিনি। দরজায় বারবার ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছিল না।
ভেতরে প্রবেশ করতেই রামিসার স্বজন ও প্রতিবেশীরা শিউরে ওঠেন। ঘরের শয়নকক্ষের মেঝের রক্তের দাগ অনুসরণ করে খাটের নিচে পাওয়া যায় রামিসার ক্ষতবিক্ষত মস্তকবিহীন শরীর। আর বাথরুমের একটি প্লাস্টিকের বালতির ভেতর রাখা ছিল তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি। লাশ পুরোপুরি গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে অবলীলায় কেটে ফেলে শিশুটির মাথা ও দুই হাত।
'বিচার চাই না' — একজন বাবার মর্মভেদী আর্তনাদ
রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বুধবার গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে যা বললেন, তা হয়তো আগামী দিনের ইতিহাসের পাতায় উঠে আসবে প্রশ্ন হয়ে। তিনি বলেন, 'আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।' পরিবারের বয়ান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সামনেও তিনি একই হতাশা ব্যক্ত করেছেন — আরেকটা বড় ঘটনা ঘটলে এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই শোকার্ত বাবা। তিনি আরও জানান, ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে থাকলেও কারও সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা নেই তাঁর। নিজের কাজ শেষ করে রাত আটটা-নয়টার মধ্যেই ঘরে ফেরেন। অথচ সেই নিরীহ গোছের পরিবারের কোলের ছোট মেয়েটিকে কেড়ে নিল মাত্র দুই মাস আগে আসা ভাড়াটিয়া।
ঘাতকের পলায়ন ও স্ত্রীর নৃশংস সহযোগিতা
এ ঘটনায় উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য। রামিসার মা বাইরে দাঁড়িয়ে যখন চিৎকার করছিলেন, তখন ঘাতক সোহেলকে পেছনের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ভেতরের পুরোটা সময় দরজা শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সোহেল নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ পর স্বপ্না দরজা খোলে। ঘটনাস্থলেই উপস্থিত জনতা স্বপ্নাকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়। স্বপ্না প্রথমে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর নাটক করলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জেরার মুখে তার অপরাধের সক্রিয় অংশীদারত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে জানালার গ্রিল গলে পালিয়ে যাওয়া সোহেল রানা ঢাকা ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় আত্মগোপন করে। পালিয়ে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজনে সে তার এক বন্ধুর সাহায্য চায়। সেই বন্ধু বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠালে, সোহেল ফতুল্লা থানার সামনের একটি বিকাশের দোকানে সেই টাকা তুলতে গেলে ঘাতক সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানা গেছে, ইতিপূর্বেও নাটোরের একটি নাশকতার মামলায় এই সোহেল অভিযুক্ত ছিল এবং সে নিয়মিত তার নিজের স্ত্রীর ওপরও বিকৃত নির্যাতন চালাত।
আদালতের কাঠগড়ায় দায় স্বীকার
গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান আসামিদের আদালতে হাজির করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে সোহেল রানা স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, অপরাধের আলামত নষ্টের চেষ্টা ও স্বামীকে পালাতে সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে হাজির করা হলে, শুনানি শেষে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। রামিসার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পুলিশ জানিয়েছে, কেমিক্যাল ও ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে।
দ্রুত বিচারের দাবিতে সরব দেশ
বুধবার সকালে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারা দেশ থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। নাগরিক সমাজ, অভিভাবক এবং শিশু অধিকার সংগঠনগুলো আবাসিক এলাকায় ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা যাচাইয়ে কড়াকড়ি আরোপের দাবি তুলেছে।
নিস্তব্ধ পল্লবী, অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
এই ঘটনার পর থেকে পুরো মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে প্রতিবেশী চোখের সামনে প্রতিদিন ঘোরাফেরা করত, সেই মানুষটির ভেতরে এমন এক আদিম হিংস্র জানোয়ার লুকিয়ে ছিল— তা ভেবে শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে সহপাঠী এবং শিক্ষকদের মাঝেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিজেদের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো পাশের ঘরেই যে এত বড় নরক তৈরি হতে পারে, তা ভাবতেও পারছেন না অভিভাবকেরা। সন্তানকে চোখের আড়াল করতে এখন তীব্র আতঙ্ক কাজ করছে সবার মনে। আইনি প্রক্রিয়া হয়তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে, তবে নিহত রামিসার বাবার সেই বুকফাটা আক্ষেপ— "আপনারা বিচার করতে পারবেন না"— দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার দ্রুততা ও কার্যকারিতার দিকে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে। পুরো এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই নরপিশাচ দম্পতির যেন দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।