Image description
১০২ ইউনিয়নে পাইলট কার্যক্রম

সম্প্রতি রাজশাহীতে এক পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিয়ে নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। আর এই অভিযোগ করেছেন একই বাহিনীর এক নারী সার্জেন্ট। ওই পুলিশ পরিদর্শক আগের বৈবাহিক তথ্য গোপন রেখে নারী সার্জেন্টকে বিয়ে করেন। সমাজে এমন তথ্য গোপন করে প্রথম স্ত্রীর অগোচরে দ্বিতীয় বিয়ের বহু ঘটনা ঘটছে। শুধু তাই নয়, বাল্যবিয়ে, মোহরানা জালিয়াতি, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, প্রতারণামূলক তথ্য প্রদান করে বিয়ে করাসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। আবার তালাকের ক্ষেত্রেও এমন জালজালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।

এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বিয়ে ও তালাকের রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) অনলাইনে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রকল্পের পাইলট এলাকা হিসেবে দেশের ১০২টি ইউনিয়নকে টার্গেট করা হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে এ কার্যক্রমের পরিধি বাড়বে। এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার এনআইডি (জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন) অনুবিভাগের সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া শিগগিরই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আইন মন্ত্রণালয় এমওইউ স্বাক্ষর করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের জন্ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৃত্যু, বিয়ে ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক তথ্য প্রয়োজন হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সর্বজনীন সেবা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের ব্যক্তিজীবনের কিছু মৌলিক তথ্য রাষ্ট্রের কাছে নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্টাটিসটিক্স বা সিআরভিএসের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। চলমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে জন্ম, মৃত্যু, মৃত্যুর কারণ, বিবাহ, তালাক, এবং দত্তক—এই ছয়টি তথ্য সিআরভিএসের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ শিক্ষা এবং অভিগমনকেও (মাইগ্রেসন) সিআরভিএসের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সিআরভিএস কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারের আইন মন্ত্রণালয় সিআরভিএস: বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। এ ছাড়া সিআরভিএস কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট ছয়টি মন্ত্রণালয় পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এসব প্রকল্পের সমন্বয় করবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে হাতে লিখে বিবাহ নিবন্ধনের পরিবর্তে অনলাইনভিত্তিক নিবন্ধনের প্রচলন হবে। বিয়ে নিবন্ধন সিস্টেম সিআরভিএস সচিবালয় তথা মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে আন্তঃসংযোগের সাহায্যে স্থানীয় সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জাতীয় পরিচায়পত্র কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিধায় তাৎক্ষণিক এবং নির্ভুল নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন সম্ভব হবে। এ কার্যক্রম স্থানীয় সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত বিধায় অপরিণত বিয়ে নিবন্ধন তথা বাল্যবিয়ে সম্ভব হবে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাল্যবিয়ে রোধ হওয়ায় বিশেষত নারীদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত হবে। অল্প বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবজনিত কারণে নারী মৃত্যুহার রোধ হবে। অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে পুষ্টিহীন শিশুর জন্ম হবে না। জনগণ স্বল্প সময়ে বিয়ে ও তালাকের সার্টিফিকেট প্রাপ্ত হবেন। বিয়ে-সংক্রান্ত প্রতারণা রোধ হবে। এ ছাড়া আরও বহুবিধ সুবিধাদি সৃষ্টি হবে।

জানা গেছে, আইন ও বিচার বিভাগ বিয়ে ও তালাকের ডিজিটাল নিবন্ধনের জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। এটি ওয়েব বেইজড রিয়েলটাইম ডাটাবেজ সফটওয়্যার। নিকাহ রেজিস্ট্রার বর-কনের বয়স আইনানুগভাবে নিশ্চিত হলে নির্ধারিত ফরম অনলাইনে পূরণ করে বিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন। একইভাবে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তালাক নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য সফটওয়্যারটি ওয়েব বেইজড বিধায় নিবন্ধকরা ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, অ্যানড্রয়েড মোবাইল, ট্যাব বা অন্য যে কোনো ডিভাইসের মাধ্যমে অনলাইনে প্রবেশ করে নিবন্ধনকাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। বিয়ে এবং মৃত্যু নিবন্ধনকারীদের অনলাইনে নিবন্ধনকাজে উৎসাহ প্রদান করার জন্য পাইলট এলাকায় কাজিদের ল্যাপটপ ফোন প্রদান করা হবে। কাজির মাধ্যমে হাতে লিখে নিকাহ রেজিস্ট্রারের পরিবর্তে অনলাইনে বিয়ে ও তালাকের নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে তা ডাটা সেন্টারে জমা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ডাটার ব্যাকআপের ব্যবস্থা করবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি সফটওয়্যার ব্যবহার করার জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এ প্রশিক্ষণ প্রদানের ফলে এ খাতে আইটি জ্ঞানসম্পন্ন একটি দক্ষ জনবল তৈরি হবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে দ্য মুসলিম ম্যারেজেস অ্যান্ড ডিভোর্সেস (রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট ১৯৭৪ অনুসারে মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন হয়ে থাকে। আর বিবাহ নিবন্ধন আইন-২০১২ অনুসারে হিন্দুদের বিয়ে নিবন্ধন হয়ে থাকে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে নিবন্ধনের সুনির্দিষ্ট আইন না থাকলেও তাদের নিজ নিজ ধর্মের নিয়ম আচার অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে। এর বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, এনআইডি ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর কেনাকাটা, কাজিদের প্রশিক্ষণসহ নানা কাজ রয়েছে। হয়তো এ বছরের শেষের দিকে এই প্রকল্প চালু হবে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এই প্রকল্পে আরেকটা জিনিস আছে সেটা হচ্ছে আর্কাইভিং। নতুন বিয়ে-তালাকের ডাটা যেমন সংরক্ষণ করা হবে। আবার দেশ স্বাধীনের পর থেকেও যেসব বিয়ে-তালাক হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে যত তথ্য পাওয়া যাবে, তার সবই অনলাইন ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, সিআরভিএস কার্যক্রম একটি বিশাল কর্মজজ্ঞ। এটি সম্পন্ন করতে পারলে একজন নাগরিকের সব তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ থাকবে। এতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।