Image description

সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসাবে অভিহিত করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের এ পদক্ষেপকে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম কার্যত বাতিল করার পদক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথক্করণ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক চেতনার পরিপন্থি। অথচ গণতন্ত্র সুরক্ষার জন্য সবার আগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। বুধবার যুগান্তরের কাছে কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী এভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তবে সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।

এদিকে আপিল বিভাগে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করায় বুধবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সুপ্রিমকোর্টে এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় হবে কি না, এ প্রশ্ন আপনাদের সামনে এসেছে। এ বিষয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছি, আমরা তড়িঘড়ি করে কিছু করতে চাই না। আমরা আবার পৃথক সচিবালয়ের স্কিম নিয়ে হাজির হব। আইনটি যাচাই-বাছাই করছি। বিচার বিভাগকে যুগোপযোগী করার জন্য একটি স্বচ্ছ, সুন্দর, মেধা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন বার প্রয়োজন। যদি সেটা না থাকে, তাহলে ভালো জাজ তৈরি হবে না।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে সেখানে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এর আগে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে ‘সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে অধ্যাদেশটি বাতিল করে বিএনপি সরকার। তবে বিচার বিভাগ পৃথক্করণ সংক্রান্ত রায়ে হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। যদিও এখনো আপিল করা হয়নি। একই সঙ্গে হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষের কাছে আশা প্রকাশ করেন, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে যেন সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ না করা হয়।

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় ও বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে তারা আরও ভালো আইন করবেন। তাদের কথায় আমি আশা রাখতে চাই। আমার প্রত্যাশা, আগামী বাজেট অধিবেশনে সরকার এ বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আইন পাশ করবে। তবে যদি কোনো অগ্রগতি দেখা না যায়, তাহলে বুঝতে হবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য মোটেও সহায়ক হবে না। সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সরকারের কাছে এর চেয়ে বেশি ভালো কিছু আশা করা ভুল। দেশে যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, র‌্যাব বিলুপ্ত করবে; কিন্ত করেনি। পোশাক বদলালে কি চরিত্র বদলাবে?

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করে সরকার আদালত অবমাননা করেছে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (আজ) সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করা হবে এবং আবেদনটি তিনি নিজেই করবেন। এ আইনজীবী আরও বলেন, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করায় বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি বলেন, আপিল বিভাগে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয় বিলুপ্ত করায় হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বুধবার সকালে বিচারপতি আহমেদ সোহেলের বেঞ্চে বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে বলেন, ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বিচার বিভাগে অনেক দিন পর সুবাতাস বয়েছিল। সরকার বলেছিল, অধ্যাদেশগুলো বাতিল করলেও আরও ভালো কিছু তারা যুক্ত করে আইন করবে। কিন্তু আজ সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হলো। এতে তারা ভালো মেসেজ দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না। সরকার যদি বিষয়টি বিবেচনায় রাখত, তাহলে আমরা বুঝতাম তারা এটা করবে। সবকিছু গুটিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতিকে সরকার ভুল বার্তা দিলেন। এতে আমরা আইনজীবীরা হতাশ হলাম। এতে প্রমাণ হলো-আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই যাচ্ছি।

সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া স্ট্যাটাসে এমন মন্তব্য করেন তিনি। মাহফুজ আলম লেখেন, ‘বিচার বিভাগ সংস্কার, মামলাজট নিরসন এবং বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য আলাদা সচিবালয় জরুরি ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশ নিয়ে ‘বাছবিচার’ থাকলে সেটা সংশোধন করে হলেও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় পুনরায় চালুর আহ্বান জানান তিনি।

আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাধীন এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ-বিচারকদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিতে বিএনপি সরকার খুবই বাজে একটি হস্তক্ষেপ করেছে। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই নির্দেশনার আলোকে স্বাধীন সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। বিএনপি সরকার বিচার বিভাগকে ধ্বংস করার জন্য তাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, আজ সেই নীলনকশা জনমানুষের সামনে প্রকাশিত হলো। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

অ্যাডভোকেট মোস্তফা আজগর শরিফী গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ করলাম, মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের নির্দেশনার মধ্য দিয়ে আবার আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি থেকেও পিছুটান : বিএনপির ৩১ দফায় বলা হয়েছে, বর্তমান বিচারব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে, যা বিচার বিভাগের সমস্যাবলি চিহ্নিত করে সুপারিশ প্রদান করবে। সংবিধান ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসাবে অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য সুপ্রিমকোর্টের অধীনস্থ পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণে সংবিধানে পূর্ববর্তী সময়ে বিদ্যমান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিচারপতি নিয়োগে দলীয় পক্ষপাত এড়িয়ে যোগ্যতা ও মাপকাঠিভিত্তিক ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে