Image description

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের তাত্ত্বিক পরীক্ষা গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। এবার নকল ও প্রশ্ন ফাঁসের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে পরীক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল প্রশ্নপত্রে ভুল এবং ৩০টি কেন্দ্রে ভুল বিষয় ও সেটের প্রশ্নপত্র বিতরণ। একের পর এক ভুলের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১৭ মে অনুষ্ঠিত ঢাকা বোর্ডের উচ্চতর গণিত প্রশ্নে ১২ নম্বরের ভুল ছিল। এতে বিভ্রান্তিতে সময় ব্যয় হয়েছে শিক্ষার্থীদের। ভুল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় নম্বর পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা।

তবে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সবগুলো অভিযোগ বোর্ডের কমিটি খতিয়ে দেখছে। প্রমাণিত হলে ভুল প্রশ্নে পরীক্ষার্থীদের কোনো নম্বর কাটা যাবে না। ভুলের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত ও অনিময়ত—এ দুই ধরনের প্রশ্ন পাঠানো হয়। দুটোই চলতি বছরের প্রশ্ন এবং সঠিক। তবে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা ভুলে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনিয়মিতদের প্রশ্ন আবার অনিয়মিতদের মধ্যে নিয়মিতদের প্রশ্ন বিতরণ করে ফেলেন। এটা তাদের ভুলের কারণে হয়ে থাকে। তবে ভুল ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তন এবং পরীক্ষার বাড়তি সময় দেওয়া হয়। তাছাড়া সংশ্লিষ্টদের পরীক্ষার খাতা পাঠানোর সময় তার সঙ্গে দুই ধরনের প্রশ্ন দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে দেখার জন্য পরীক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুল প্রশ্ন বিতরণে জড়িতদের পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

উচ্চতর গণিতের প্রশ্নে বড় ভুল : গণিতের পাঁচ জন শিক্ষক ও ১০ জন শিক্ষার্থী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা বোর্ডের উচ্চতর গণিতের ২ নং এর গ-এ ২:১ এর স্থলে ১:৪ হবে। ৪ নং এর গ-এ প্রমাণে ৫ এর স্থলে ৩ হবে। ৬ নং এর গ-এ চতুর্ভুজের পরিবর্তে ট্রাপিজিয়াম হবে। কারণ ট্রাপিজিয়াম ব্যতীত প্রশ্নের প্রমাণ কখনো সম্ভব না!

প্রশ্নপত্র ভুলের আরো কিছু ঘটনা :এসএসসির ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ‘ব্যবসায় উদ্যোগ’ পরীক্ষায় ভুল সিলেবাসে প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ৫৪ জন পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা 

তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। গত ১৪ মে শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে এই ঘটনা ঘটে। ঐ কক্ষে থাকা ৫৪ জন শিক্ষার্থীকে ২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের হাতে ২০২৫ সালের সিলেবাসভিত্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। ফলে নির্ধারিত পাঠ্যসূচির বাইরে প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন ঐ শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে বিষয়টি পরীক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন। এর আগে গত ২১ এপ্রিল সোনারগাঁও উপজেলার ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে একই ধরনের ঘটনায় ১৭৭ জন শিক্ষার্থীকে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্র সচিব মহিউদ্দীনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

গত ১৪ মে বরিশাল শহরের রূপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দুটি কক্ষে ‘ব্যবসায় উদ্যোগ’ বিষয়ের পরীক্ষায় আগের বছরের এমসিকিউ প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। ঐ ভুল প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরীক্ষা শেষে বিষয়টি টের পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় ভেঙে পড়ে তারা। পরীক্ষার্থীদের দাবি, পুরোনো বছরের সিলেবাস ও প্রশ্নপদ্ধতির ভিন্নতার কারণে তাদের পরীক্ষা আশানুরূপ হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া কিংবা খাতা মূল্যায়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী ৪০ পরীক্ষার্থী। এমন ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরাও। নূর ইয়াসমিন নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমাদের সন্তানেরা দুই বছর ধরে কষ্ট করে প্রস্তুতি নিয়েছে। শিক্ষকদের এমন দায়িত্বহীনতার খেসারত কেন আমাদের ছেলেমেয়েরা দেবে? আমরা এই ভুলের সুষ্ঠু সমাধান চাই, যাতে বাচ্চাদের ভবিষ্যত্ নষ্ট না হয়।’

গত ২১ এপ্রিল এসএসসির প্রথম দিনেই ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের ঘটনা ঘটে কুমিল্লার দেবীদ্বারের মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে। নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট পর ভুল প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করা হলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা।

গত ৩০ এপ্রিল মাদারীপুরের কালকিনিতে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিতরণে অনিয়মসহ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় প্রশাসন। গত ৫ মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এসএসসি পরীক্ষায় গুরুতর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। হলের ১১৩ পরীক্ষার্থীকে ভুল সেটের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি কেন্দ্রের দ্বিতীয় ভেন্যুতেও এমন ঘটনা ঘটে। পরে বোর্ডের পক্ষ থেকে কেন্দ্রসচিব ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকীকে শোকজ করা হয়। দিনাজপুরে এসএসসি পরীক্ষায় ভুল সেট কোডের প্রশ্নে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। এজন্য শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রসচিব ও ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। গত ১৬ মে মৌলভীবাজারের ফ্লাওয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভুল সেটের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ায় কেন্দ্রসচিবসহ মোট সাত জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ কেন্দ্রে পরীক্ষা পরিচালনার জন্য ছয় সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে  গত ২৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যুত্ বিভ্রাটের কারণে ১১টি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দেওয়া, একই দিনে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এক ঘণ্টা বিলম্বে পরীক্ষা শুরু হওয়া, ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলকেন্দ্রে হাঁটুসমান নোংরা পানিতে বসেই পরীক্ষা নেওয়া হয়। বাগেরহাটের শরণখোলায় সন্তান প্রসবের পাঁচ ঘণ্টা পর এবং কুড়িগ্রামে তিন দিনের নবজাতক রেখে এক মায়ের দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও এবার বেশ আলোচিত হয়।