খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে আগুন আতঙ্কে তিন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনজনের মধ্যে দুজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ও অন্যজন হৃদরোগ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (সিসিইউ) ভর্তি ছিলেন।
মৃতরা হলেন- কয়রা উপজেলার নাসরিন নাহার, দীঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রামের শেখ আবুল হাশেম ও রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের সাত্তার লস্কর। এ ঘটনায় নার্স ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীসহ ৫/৬ জন আহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। দুই কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে কমিটির সদস্যদের।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে খুলনায় অবস্থানরত স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এ সময় আইসিইউ ও সিসিইউ থেকে দ্রুত রোগীদের স্থানান্তর করা হয়। তখন অক্সিজেনের অভাবে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন নাসরিন নাহার ও শেখ আবুল হাশেম এবং সিসিইউতে চিকিৎসাধীন সাত্তার লস্কর মারা যান।
হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ আহত হন।
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় বেশিরভাগ মানুষ ঘুমাচ্ছিলেন। স্টোররুমের আগুন ছড়িয়ে পড়ে রুমের সবকিছু পুড়ে যায়। সবাই আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করে নেমে এসে হাসপাতালের মাঠে অবস্থান নেন। অনেকে তাদের রোগীদের অন্যান্য হাসপাতালে নিয়ে যান।
তারা অভিযোগ করেছেন, ওটিতে ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চলে। সেখানে এভাবে আগুন লেগে সব পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি রহস্যজনক। এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় রেজাউল করিমের ভাষ্য, ধারণা করা হচ্ছে স্টোররুম থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত বলা যাচ্ছে না। ধোঁয়ায় ওটি ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের কোনো কিছু দেখা যাচ্ছিল না। পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে মুমূর্ষু রোগীদের পেছন দরজা দিয়ে বের করা হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা নার্সদের উদ্ধার করে।
হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ সহকারী অধ্যাপক ডা. দিলীপ কুমার জানিয়েছেন, আইসিইউ ওয়ার্ডে ১৫টি সিটেই রোগী ছিল। আগুন লাগার পরপরই রোগীদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। নাসরিন নাহারের স্বজনরা তাকে আইসিইউ থেকে অক্সিজেন খুলে নিচে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়।
তিনি দাবি করেন, শেখ আবুল হাশেম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আগেই মারা গেছেন।
তবে তার ছেলে আব্দুর রহমান বলেছেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অক্সিজেনের অভাবে তার বাবা মারা গেছেন।
সিসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. মোস্তফা কামাল বলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কে সিসিইউ ছেড়ে তিনজন রোগী বাইরে চলে যান। এরমধ্যে কোর্স সিসিইউ-৫ নম্বর বেডের সাত্তার লস্কর নামে একজন রোগী মারা যান। অপর দুজন সিসিইউতে ফিরে আসেননি।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। সকাল পৌনে ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন স্টেশনের ১১টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। প্রায় ১ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
খুমেক হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী আনসার কমান্ডার এসিপি মো. আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় গ্রিল কাটতে গিয়ে গ্রিল ভেঙে পড়ে দুইজন স্টাফ নার্স ও ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আহত হয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেছেন, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুনে মেরামতযোগ্য ও পরিত্যক্ত ১২টি বেড, দুটি অকেজো এসি, ওটি রুমের দরজা, ভবনের ওয়াল ও ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তে হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (অ্যানেসথেসিওলজি) ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডুকে সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামানকে সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের দুই কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
হাসপাতালে আগুন লাগা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, আগুন লাগার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি করেছে। তবে কমিটিটি সঠিকভাবে হয়নি, প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পরামর্শ করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেবে।
এদিকে খুলনা জেনারেল হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল) আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি হাসপাতালে গিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিদর্শনের সময় কয়েকজন রোগী র্যাবিস ভ্যাকসিন পেতে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। কেউ কেউ ২৫০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে বলেও মন্ত্রীকে জানান। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গাজী রফিকুল ইসলামের কাছে এ পরিস্থিতির কারণ জানতে চান।
জবাবে তত্ত্বাবধায়ক জানালেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১১ মে পর্যন্ত এআরবি ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে ঘটনাস্থল থেকেই ঢাকায় যোগাযোগ করে মন্ত্রী জানতে পারেন, ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কোনো চাহিদাপত্র পাঠানো হয়নি। এ সময় তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেন।
পরে হাসপাতালের রান্নাঘর পরিদর্শনে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কুমড়ার তরকারি মুখে দিয়ে তিনি তা ফেলে দেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, এ ধরনের তরকারি আপনাদের বাসায় রান্না হলে কি খেতেন?
এ সময় হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্টকে রোগীদের জন্য ভালো মানের খাবার সরবরাহের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনের সময় তিনি হাসপাতালের বহির্বিভাগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শৌচাগারও ঘুরে দেখেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।