Image description

আট মাস বয়সী মেয়ে তাবাসসুমকে কোলে নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হাসপাতালের ওয়ার্ডে বসে ছিলেন রুবিনা আক্তার। দীর্ঘ এক সপ্তাহের অনিশ্চয়তা, জ্বর, কান্না আর হাসপাতাল বদলের পর অবশেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন—এই স্বস্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। কিন্তু সেই স্বস্তির আড়ালেই জমে আছে আরেক ভয়—চিকিৎসার খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের চাপ।

“মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠছে, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। কিন্তু এখন ৩০ হাজার টাকার ধার কীভাবে শোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না,” বলেন রুবিনা।

পাবনার বাসিন্দা রুবিনার স্বামী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। ছোট মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় আসার পর তিনি বাড়িতে থেকে অন্য দুই সন্তানকে দেখাশোনা করছেন। ফলে কয়েকদিন ধরে কোনও আয় নেই। সাত

বছর ও সাড়ে তিন বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে মেয়ের চিকিৎসার জন্য একাই ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন রুবিনা।

তিনি জানান, প্রায় এক মাস ধরেই মেয়ের জ্বর আসা-যাওয়া করছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরলেও পরদিনই শিশুটির ১০৪ ডিগ্রি জ্বর আসে এবং সে অচেতন হয়ে পড়ে। স্থানীয় চিকিৎসক এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলে জ্ঞান ফেরে, কিন্তু জ্বর কমছিল না। তখনই ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

টাকার অভাবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে পারেননি। মাত্র ৮৫০ টাকা হাতে নিয়ে বাসে করে অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা দেন। স্বামী বলেছিলেন, “তুমি আগে রওনা দাও, পরে টাকা পাঠাচ্ছি।”

রুবিনা বলেন, “বাসের মধ্যে বাচ্চা খুব কাঁদছিল। শরীর এত গরম ছিল যে কোলে ধরে রাখতেও ভয় লাগছিল।”

রাতে ঢাকায় পৌঁছে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে থাকেন। প্রথমে শিশু হাসপাতালে যান, সিট না থাকায় ভর্তি নেয়নি। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—কোথাও জায়গা হয়নি। রাত তখন প্রায় ১২টা।

“হাসপাতালের গেট থেকে বের হয়ে শুধু কাঁদছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় যাব,” বলেন রুবিনা।

ঠিক তখনই এক সিএনজিচালক তাদের মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রাত ১টার দিকে সেখানে মেয়েকে ভর্তি করানো হয়। শুরু হয় চিকিৎসা, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

চিকিৎসকরা শিশুটির শরীর অত্যন্ত দুর্বল উল্লেখ করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু রুবিনার কণ্ঠে অসহায়তা, “আমরা তো স্বাভাবিক খাবারই ঠিকমতো খেতে পারি না, ভালো খাবার কোথা থেকে কিনব?”

হাসপাতালে থাকার এই এক সপ্তাহে ওষুধ, পরীক্ষা, খাবার ও যাতায়াত মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এর বেশিরভাগই ধার। রুবিনার মা, যিনি বাসাবাড়িতে কাজ করেন, তিনিও হাসপাতালে এসে মেয়ের পাশে ছিলেন কয়েকদিন।

শুধু রুবিনা নন, হামের প্রাদুর্ভাবে একই ধরনের সংকটে পড়েছেন আরও অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার।

নীলফামারীর ডিমলা থেকে আসা রেজাউল ও রাবেয়া দম্পতির সাত মাস বয়সী মেয়ে রিফাও এখন ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জীবিকার তাগিদে তারা মিরপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন। বাবা রিকশা চালান, মা গার্মেন্টসে কাজ করেন। দিনের বেলা বাবা সন্তানদের দেখেন, রাতে মা বাসায় ফিরলে রিকশা নিয়ে বের হন তিনি।

মে মাসের ২ তারিখে হঠাৎ শিশুটির জ্বর ও কাশি শুরু হয়। প্রথমে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শরীরে র‍্যাশ, মুখে ঘা এবং তীব্র জ্বর দেখা দেয়। শিশুটি খাওয়া বন্ধ করে দেয়।

১০ মে শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলেও সিট না থাকায় ভর্তি নেয়নি। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠানো হয়। কিন্তু পরদিন কাশির সঙ্গে রক্ত আসতে শুরু করলে পরিবারটি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এরপর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল হয়ে শেষ পর্যন্ত ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

রাবেয়া বলেন, “ছোট বাচ্চার হাতে-পায়ে এতবার সিরিঞ্জ ঢুকিয়েছে যে পুরো হাত ফুলে গেছে। পরে আইসিইউতে নিয়ে ক্যানোলা দিতে হয়েছে।”

১৬ মে রাতে শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরদিন কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও ওয়ার্ডে ফেরানো হয়নি।

এই ১৫ দিনে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু দুজনেরই কাজ বন্ধ।

“মানুষের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা চালাচ্ছি। সামনে আরও কত খরচ হবে, জানি না,” বলেন রেজাউল।

ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় রেখে আসা হয়েছে তাদের আট বছর বয়সী বড় মেয়েকে। অন্যদিকে রাবেয়া দুশ্চিন্তায় আছেন গার্মেন্টসের চাকরি থাকবে কিনা তা নিয়ে।

“একদিকে মেয়ে আইসিইউতে, অন্যদিকে ঋণের চাপ। মাথা কাজ করে না,” বলেন তিনি।

গত কয়েক দিনে ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ডিএনসিসি হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে জটিলতা সামাল দেওয়া না গেলে পরিবারগুলোকে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। আর এই যাত্রাই অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য নতুন আর্থিক বিপর্যয় তৈরি করছে।

অনেক পরিবার জানায়, হামের আগেই অন্য রোগে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এরপর হাম ধরা পড়লে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক পরিবার জানায়, ছোট সন্তান নিউমোনিয়া ও হাম থেকে সেরে ওঠার কিছুদিন পর বড় সন্তানের শরীরেও হাম দেখা দেয়। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় আনা হয়।

পরিবারটির ভাষ্য, “শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসতেই ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আগের সন্তানের চিকিৎসায় ৪০ হাজার টাকা গেছে। এখন আবার নতুন করে খরচ শুরু।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে। কারণ, সেখানে টিকাদানের হার কম, অপুষ্টি বেশি এবং সচেতনতারও ঘাটতি রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “অপুষ্টি ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ফলে নিম্ন আয়ের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আর্থিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার দেরিতে হাসপাতালে আসে। তখন রোগ জটিল হয়ে যায়, চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যায়।”

“যখন তারা বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসে, তখন অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে,” বলেন তিনি।

তার মতে, শুধু চিকিৎসা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে অর্থের অভাবে কোনও শিশুর চিকিৎসা থেমে না যায়।