ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সাম্প্রতিক সময়ে আদর্শিকভাবে ডানপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে কি না এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শ থেকে নেতাকর্মীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা, জামায়াতঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যোগদান এবং ইসলামপন্থি জোটের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার পর এ বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতঘরানার বিভিন্ন সংগঠন থেকে নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগ দিতে দেখা গেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে এসব ‘যোগদান অনুষ্ঠান’ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলকে সাংগঠনিকভাবে বড় করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের মানুষের সমাবেশ ভবিষ্যতে দলটির আদর্শিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে সাবেক শিবির নেতাদের এনসিপিতে যোগদান এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে দলটির সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এনসিপি আদৌ মধ্যপন্থি অবস্থানে আছে কি না। কেউ কেউ দলটিকে ‘জামায়াতের বি-টিম’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দল গঠনের সময় এনসিপির নেতারা নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। দল ঘোষণার আগে তৎকালীন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, তারা এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে চান যেখানে বাম-ডান বিভাজনের বাইরে থেকে বাংলাদেশ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি করা সম্ভব হবে। তিনি বলেছিলেন, ইসলামফোবিয়া, উগ্র ইসলামপন্থা কিংবা উগ্র হিন্দুত্ববাদ কোনোটির সঙ্গেই তারা নেই।
সেই সময় আখতার হোসেন আরও বলেছিলেন, দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং এনসিপি ধীরে ধীরে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারে।
তবে দল গঠনের এক বছরের বেশি সময় পর এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এনসিপি মধ্যপন্থি পরিচয়ের বদলে জামায়াতের ছায়ায় চলে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শুরুর সেই ধারণাটা এখন আর নেই। জামায়াতের সঙ্গে জোট করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে এনসিপিকে মধ্যপন্থি দল বলার সুযোগ দেখছি না। এমনকি একটা দলের যে মেনিফেস্টো থাকে, তারা এতদিনেও সেটা দিতে পারেনি। ফলে তাদের আদর্শ নিয়ে একটা দোলাচল আছেই।”
দলটির ভেতরেও আদর্শিক মতপার্থক্য নিয়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে। একপর্যায়ে বাম ঘরানার অনেক নেতা দল ছাড়েন। নির্বাচনের আগে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের ইস্যুতে নারী নেত্রীদের কেউ কেউও দলত্যাগ করেন। অনেকে আবার সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, দল ছাড়ার পেছনে জামায়াত ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার ভাষায়, “টপ লেয়ারের নেতাদেরও একটা অংশ সাবেক শিবির বা শিবির থেকে বের হয়ে আসা মানুষ। তাদের সংখ্যা যখন সর্বত্র থাকে, তখন দলটি তো ইতোমধ্যেই ডানপন্থায় চলে গেছে।”
তবে এনসিপির নেতারা শুরু থেকেই জামায়াতঘনিষ্ঠতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এনসিপির ডানপন্থি হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “বিএনপিও প্রায় ২৯ বছর জামায়াতের সঙ্গে জোটে ছিল। কিন্তু বিএনপি জামায়াতে বিলীন হয়নি, জামায়াতও বিএনপিতে বিলীন হয়নি। বরং জামায়াত ধীরে ধীরে বড় রাজনৈতিক দল হয়েছে। এনসিপিরও জামায়াতের বি-টিম হওয়ার সুযোগ কম। কারণ মূল পার্থক্যটা আদর্শগত জায়গায়।”
সারজিস আলমের দাবি, জামায়াত ধর্মভিত্তিক ও ডানপন্থি রাজনীতি করে, আর এনসিপি মধ্যপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তার মতে, সংসদে জামুকা বিল পাসের সময় এনসিপি স্পষ্টভাবে সমর্থন জানিয়েছে, যদিও জামায়াতের অবস্থান ভিন্ন ছিল। এতে দুই দলের আদর্শিক পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গঠিত এনসিপি নির্বাচনের আগে সংগঠন গোছাতে খুব বেশি সময় পায়নি। দলটির নেতারা আশা করেছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক ইমেজ কাজে লাগিয়ে দ্রুত তৃণমূলভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তারা অল্প সময়ের মধ্যে ৬৪ জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জ সফরে গিয়ে এনসিপির শীর্ষ নেতারা হামলার মুখে পড়েন। পরে সেনাপ্রহরায় তাদের গোপালগঞ্জ ত্যাগ করতে হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এতসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এনসিপি প্রথমদিকে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে শেষ পর্যন্ত দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়। ওই জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপি ছয়টি সংসদীয় আসনে জয় লাভ করে।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনী জোট ধীরে ধীরে রাজনৈতিক জোটে রূপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে জোটের পক্ষ থেকে যৌথ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে যে, এনসিপি স্থায়ীভাবে ডানপন্থি বলয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না।
তবে সারজিস আলম মনে করেন, নির্বাচনী জোট দলটির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, “আমরা যদি এককভাবে নির্বাচন করতাম, আমাদের আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যও হতে পারত। দল গঠনের মাত্র একবছর বা ছয় মাসের মধ্যে এক-দুইটি আসন জেতার আত্মবিশ্বাস তৈরি করা খুব কঠিন ছিল। সে জায়গায় ছয়টি আসন পাওয়া দলের জন্য প্লাস পয়েন্ট।”
তার মতে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন সহজ হয়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন সংসদে আমাদের প্রতিনিধিরা প্রশংসিত হয়েছেন। শীর্ষ আলোচিত পাঁচজন সংসদ সদস্যের তালিকায় অন্তত তিনজন এনসিপির।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার আগেই ক্ষমতার বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া এনসিপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তার ভাষায়, ‘মানুষ এখন ধরেই নিয়েছে, এনসিপির যারা এমপি হয়েছেন তারা জামায়াতের সমর্থনেই হয়েছেন। অর্থাৎ জামায়াত ছাড়া তাদের ভোট খুব একটা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সেটা দলটিকে আরও দুর্বল করবে এবং আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’